মূল লেখায় যান
বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬, ১:০৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
অন্যান্য

অল্পের জন্য বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেল বাংলাদেশের স্যাটেলাইট-১

প্রতিবেদক:
অল্পের জন্য বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেল বাংলাদেশের স্যাটেলাইট-১

মহাকাশে ভারতের পুরোনো একটি স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল বাংলাদেশের একমাত্র যোগাযোগ স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর (বিএস-১)। গত ৯ আগস্ট সন্ধ্যায় এ বিষয়ে সতর্কবার্তা পাওয়ার পর টানা কয়েক দিন ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ ও হিসাব-নিকাশ করেন বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) প্রকৌশলীরা। শেষ পর্যন্ত ১৩ আগস্ট স্যাটেলাইটটির অবস্থানে সামান্য পরিবর্তন এনে সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়ানো হয়।

রাজধানীর বাংলামোটরে বিএসসিএলের কার্যালয়ে বুধবার (৬ অক্টোবর) সকালে ওই ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান।

তিনি বলেন, ‘ওই কয়েকটি দিন খুবই উদ্বেগের মধ্যে কেটেছে। হাতে সময় কম ছিল। আবার বিএস-১-কে সরানোর সুযোগও ছিল সীমিত। তবে শেষ পর্যন্ত বিপদ হয়নি। স্যাটেলাইটটি রক্ষা করা গেছে।’

যেভাবে তৈরি হয়েছিল সংঘর্ষের আশঙ্কা

গত ৯ আগস্ট সন্ধ্যায় বিএসসিএলের গাজীপুরের জয়দেবপুর গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনে একটি সতর্কবার্তা আসে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ নজরদারি ও ট্র্যাকিং তথ্যের সরকারি প্ল্যাটফর্ম স্পেস ট্র্যাকার জানায়, বিএস-১-এর দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছে একটি মহাকাশযানের ধ্বংসাবশেষ।

পরে বিএসসিএল জানতে পারে, বস্তুটি ভারতের পুরোনো ইনস্যাট-১এ স্যাটেলাইটের একটি অংশ। ধ্বংসাবশেষটি বিএস-১-এর খুব কাছ দিয়ে অতিক্রম করার কথা থাকায় সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়। এমন সংঘর্ষ হলে বাংলাদেশের যোগাযোগ স্যাটেলাইটটি ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা পুরোপুরি অচল হয়ে যেতে পারত।

এরপর পরবর্তী চার দিন জয়দেবপুর গ্রাউন্ড স্টেশনে স্যাটেলাইটটির অবস্থান, ধ্বংসাবশেষের গতিপথ এবং সম্ভাব্য সংঘর্ষের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করেন প্রকৌশলীরা। একই সঙ্গে বিএস-১-এর অবস্থান পরিবর্তন করলে নতুন কোনো ঝুঁকি তৈরি হবে কি না, সেটিও হিসাব করা হয়।

৮৫২ মিটারের মধ্যে চলে এসেছিল ধ্বংসাবশেষ

বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে ইনস্যাট-১এ-এর ধ্বংসাবশেষটি বিএস-১-এর মাত্র ৮৫২ মিটারের মধ্যে চলে এসেছিল। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ১৩ আগস্ট বিএস-১-এর অবস্থান সামান্য বাঁ দিকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

ধ্বংসাবশেষটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা অতিক্রম না করা পর্যন্ত স্যাটেলাইটটিকে নতুন অবস্থানে রাখা হয়। বিপজ্জনক সময় পার হওয়ার পর সেটিকে আবার আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

ইমাদুর রহমান বলেন, ‘ধ্বংসাবশেষটি এড়িয়ে বিএস-১-কে সরানো হবে কি না, সরানো হলে কোন দিকে এবং কতটা সরানো যাবে—এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হচ্ছিল। স্যাটেলাইটকে নতুন অবস্থানে নিলে সেখানেও কোনো ঝুঁকি তৈরি হবে কি না, সেটিও হিসাব করতে হচ্ছিল।’

তার ভাষ্য, পুরো প্রক্রিয়ায় বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি এবং বিএসসিএলের প্রকৌশলীদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।

ইনস্যাট-১এ-এর ইতিহাস

ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর তথ্য অনুযায়ী, ইনস্যাট-১এ ১৯৮২ সালের ১০ এপ্রিল উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। উৎক্ষেপণের কয়েক মাসের মধ্যেই স্যাটেলাইটটিতে সমস্যা দেখা দেয় এবং ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর সেটি নিষ্ক্রিয় করা হয়।

তবে দীর্ঘ সময় পরও এর বিভিন্ন অংশ মহাকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মহাকাশে সচল স্যাটেলাইটের পাশাপাশি এ ধরনের অকেজো স্যাটেলাইট, উৎক্ষেপণযানের অংশ এবং নিয়ন্ত্রণ হারানো মহাকাশযানের বিভিন্ন অংশকে স্পেস ডেব্রিস বা মহাকাশের বর্জ্য বলা হয়।

কোনো স্যাটেলাইটের সঙ্গে এসব বর্জ্যের সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হলে বিভিন্ন মহাকাশ ট্র্যাকিং ব্যবস্থা থেকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। বিএসসিএলও নিয়মিত এ ধরনের তথ্য পর্যবেক্ষণ করে।

এর আগেও ঝুঁকিতে পড়েছিল বিএস-১

বিএস-১-এর জন্য এবারই প্রথম মহাকাশে সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হয়নি। বিএসসিএল সূত্র জানায়, ২০২১ ও ২০২৫ সালেও স্যাটেলাইটটির সঙ্গে মহাকাশের অন্য বস্তুর সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

২০২১ সালে রাশিয়ার একটি স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ বিএস-১-এর জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছিল। আর ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্যাটেলাইট বিএস-১-এর খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল।

মহাকাশে এ ধরনের সংঘর্ষের ভয়াবহতার উদাহরণও রয়েছে। ২০০৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার অকেজো স্যাটেলাইট কসমস-২২৫১ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সচল যোগাযোগ স্যাটেলাইট ইরিডিয়াম-৩৩-এর মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে দুটি স্যাটেলাইটই ধ্বংস হয়েছিল।

২৪ ঘণ্টা নজরদারিতে বিএস-১

২০১৮ সালের ১২ মে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে বিএস-১ উৎক্ষেপণ করা হয়। বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, স্যাটেলাইটটি তৈরি ও উৎক্ষেপণে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক হওয়া বিশ্বের ৫৭তম দেশ হয়ে ওঠে।

ফ্রান্সের থালেস অ্যালেনিয়া স্পেস ২০১৮ সালে বিএস-১ তৈরি করে। শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকা তিনটি গ্রাউন্ড স্টেশনের মাধ্যমে স্যাটেলাইটটির কার্যক্রম পরিচালিত হতো। পরে সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ২০২১ সাল থেকে এর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয় বিএসসিএল।

বর্তমানে গাজীপুরের জয়দেবপুরে অবস্থিত গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনটি বিএস-১ পরিচালনার প্রধান কেন্দ্র। সেখানে ৫০ জনের বেশি প্রকৌশলী কাজ করেন এবং ২৪ ঘণ্টা স্যাটেলাইটটির ওপর নজরদারি রাখা হয়।

৯ আগস্ট সতর্কবার্তা পাওয়ার পর প্রকৌশলীদের সতর্ক করা হয় এবং ছুটি বাতিল করা হয়। ধ্বংসাবশেষের গতিপথ ও অবস্থান নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

দেশের টেলিভিশন চ্যানেল ব্যবহার করছে সেবা

বিএস-১-এ মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি বাংলাদেশের জন্য এবং বাকি ২০টি বিদেশি গ্রাহকদের ব্যবহারের জন্য ইজারা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এসব ট্রান্সপন্ডার থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ রয়েছে।

বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল বর্তমানে বিএস-১-এর সেবা ব্যবহার করছে। ফলে মহাকাশে স্যাটেলাইটটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়, দেশের যোগাযোগ ও সম্প্রচার ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।