ঝিনাইদহে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, তালিকায় জেলা বিএনপি সভাপতির ভাই
ঝিনাইদহে সার ডিলার নিয়োগের তালিকা ঘিরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। জেলা ও উপজেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির বিরুদ্ধে নীতিমালা উপেক্ষা করে ডিলার নিয়োগ এবং আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট পরিবারকে পুনর্বাসনের অভিযোগ উঠেছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) দুপুরে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে ডিলারদের তালিকা প্রকাশের পর এ নিয়ে জেলাজুড়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।
তালিকায় রাজনৈতিক পরিচয় ও পারিবারিক সম্পর্কের অভিযোগ সামনে আসায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে আলোচনা-সমালোচনা। প্রকাশিত তালিকায় হরিণাকুণ্ডু উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নে ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সভাপতি এমএ মজিদের ভাই আব্দুল লতিফের নাম রয়েছে। এ ছাড়া দৌলতপুর ইউনিয়নে সালেহা বেগম মহিলা কলেজের এমপিওভুক্ত শিক্ষক আনিচুরের স্ত্রী আনোয়ারা নাসরিনের নাম থাকায় নিয়োগের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ওই নারীর মেয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেও জানা গেছে। একই উপজেলার জোড়াদহ ইউনিয়নে ওএমএস ডিলার লাল্টু মিয়া এবং ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সাধুহাটী ইউনিয়নে গোবিন্দপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেনের নাম রয়েছে। আনোয়ার হোসেন আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্য এবং বিএনপি সভাপতির ঘনিষ্ঠ কর্মী বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এদিকে জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও সাগান্না ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন আল মামুন এর শ্যালক হাফিজুর রহমান লিটন এর নামও রয়েছে কিন্তু তার সারের সাথে কোন সময়ই সম্পৃক্ততা নেই। মহেশপুর উপজেলায়ও তালিকা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সেখানে উপজেলা যুবলীগের সভাপতির ভাই এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনার শ্যালক এহসান রেজার নাম রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মহেশপুর পৌর এলাকায় হাবিবুর রহমান বুল্লা, যিনি একসময় আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ির কেয়ারটেকার ছিলেন বলে দাবি করা হচ্ছে, তাঁর নামও তালিকায় রয়েছে। এ ছাড়া যাদবপুর ইউনিয়নে সবুর খান এবং বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নে শাকিল রিয়াজ শুভর নাম থাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। কালীগঞ্জ উপজেলার ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নে জেলা বিএনপির সভাপতির শ্যালকের স্ত্রী সুরমা হাসান এবং শিমলা-রোকনপুর ইউনিয়নে তাঁর চাচাতো শ্যালক নাজমুল হক মিশুর নাম নিয়েও সমালোচনা হচ্ছে। সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালা অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক বা সরকারি কর্মচারীর স্ত্রী কিংবা মায়ের ডিলারশিপ পাওয়ার যোগ্যতা নিয়ে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, হরিণাকুণ্ডুর দৌলতপুর ইউনিয়নে এমপিওভুক্ত শিক্ষক আনিচুরের স্ত্রী আনোয়ারা নাসরিনকে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নীতিমালা ও নিয়োগের নথি যাচাই করে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, তালিকায় স্থান পাওয়া কয়েকজনের ব্যাংক সচ্ছলতার সনদ, আর্থিক সক্ষমতা ও সার সংরক্ষণের গুদাম থাকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। হলিধানী ইউনিয়নের আমির হোসেনের গুদাম ও আর্থিক সক্ষমতা নেই এবং তাঁর ব্যাংক সচ্ছলতার সনদ নিয়ে অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই কিংবা সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে, পাগলাকানাই ইউনিয়নের ডিলার রাকিব হাসান বন্ধন ছাত্রলীগের সদস্য ছিলেন বলে দাবি করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক শাহেদ আহম্মেদ। অন্যদিকে, হরিণাকুণ্ডুর চাঁদপুর ইউনিয়নে ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের জন্য ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও ৮ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ডিলার নিয়োগ করা হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেছেন সাকিব হোসেন নামের এক ব্যক্তি। এ বিষয়ে হরিণাকুণ্ডু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রদীপ্ত রায় দীপন বলেন, আমার কাছে তো কোনো সার ডিলারের তদন্ত প্রতিবেদনই আসেনি। আচ্ছা, আমি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে শুনে জানাব। হরিণাকুণ্ডু উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শরীফ মোহাম্মদ তিতুমীরের বিরুদ্ধে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে নীতিবহির্ভূত তালিকা তৈরির অভিযোগও উঠেছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দবির হোসেন উদ্দীন বিশ্বাস বলেন, মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মেহেদী হাসান রনি আমার কাছে পাঁচজনের রাজনৈতিক অবস্থান জানতে চান। আমি সুনির্দিষ্টভাবে জানিয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি, আমরা নৌকার তলে চাপা পড়েছি। এখন আর বিএনপি করার কোনো মানে হয় না। ঝিনাইদহ জেলা থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। ফলে আমার ছেলের নামটিও ডিলারের তালিকায় নেই।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনা বলেন,আমার শ্যালক জেলা বিএনপির কমিটিতে আছে। তাই আওয়ামী পরিবারের সদস্য—এমন অভিযোগ সঠিক নয়। তাছাড়া সারা জেলার তালিকা সম্পর্কে আমি জানি না। এ বিষয়ে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি নোমান হোসেনে গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে কথা বলতে রাজি হননি।
