অর্থবিল-২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস
কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ বাতিলসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী এনে জাতীয় সংসদে অর্থবিল-২০২৬ পাস হয়েছে। সোমবার (২৯ জুন) বিকেলে স্পিকারের সভাপতিত্বে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি চূড়ান্ত পাসের জন্য সংসদে উত্থাপন করলে কণ্ঠভোটে তা অনুমোদিত হয়।
পাস হওয়া অর্থবিলে কালো টাকা সাদা করার বিধান বাতিলের পাশাপাশি ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন নম্বর বাধ্যতামূলক রাখা হয়নি।
এর আগে বিলটির সাধারণ নীতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। সংসদ সদস্যরা বিশাল বাজেট ঘাটতি, কর ও ভ্যাটের চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের সংকট এবং বৈদেশিক ঋণসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে বিলটি অধিকতর যাচাইয়ের দাবি জানান। আলোচনা শেষে কয়েকটি সংশোধনী যুক্ত করে বিলটি চূড়ান্তভাবে পাস করা হয়।
বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার একটি দুর্বল অর্থনীতি ও ভঙ্গুর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উত্তরাধিকার হিসেবে পেলেও টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে আশাবাদী। কার্যকর নেতৃত্ব, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, দক্ষ প্রশাসন এবং জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, সরকার ধীরে ধীরে ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বেসরকারি বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থান ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হবে।
অর্থমন্ত্রী সংসদ সদস্য, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং গণমাধ্যমের গঠনমূলক মতামত ও সমালোচনার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এ বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি বাস্তবভিত্তিক রূপরেখা।
মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬.৫ শতাংশ নির্ধারণের যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, দুর্নীতি, অর্থপাচার, বিনিময় হার নিয়ে কারসাজি এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অর্থনীতি চাপে রয়েছে। তবে কৃষি, শিল্প, সেবা খাত এবং প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক প্রবণতা সরকারের নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে সহায়ক হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার সমালোচনার জবাবে অর্থমন্ত্রী আশ্বস্ত করে বলেন, সরকার করের হার বাড়াবে না, বরং করের আওতা সম্প্রসারণ করবে। স্বচ্ছতা বাড়াতে করনীতি ও কর প্রশাসনকে সম্পূর্ণ পৃথক করা হচ্ছে এবং কর ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য প্রস্তাবিত একক হারের ভ্যাট ব্যবস্থার বাইরে ঐতিহ্যবাহী বাজার ও ছোট মুদি দোকানগুলোকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা হবে।
তিনি জানান, বর্তমান সরকারের বিভিন্ন সময়োপযোগী উদ্যোগের ফলে চলতি অর্থবছরে প্রথমবারের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায় ৪ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। আগামী অর্থবছরে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট বাজেটের ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা হবে, যা চলতি অর্থবছরে ছিল মাত্র ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় বর্তমানের ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে।
পূর্ববর্তী সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, অতীতে যত্রতত্র ঋণের কারণে বাংলাদেশের ঋণঝুঁকি নিম্ন পর্যায় থেকে মধ্যম পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট জিডিপির ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ১১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান সরকারকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এই বিশাল ঋণের আসল ও চড়া সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা বর্তমান সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর একটি বিশাল চাপ সৃষ্টি করেছে।
এই ঋণ নির্ভরতা কমাতে আগামী অর্থবছরে ব্যাংকঋণ ৬ হাজার কোটি টাকা কমানো, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা এবং বন্ড ও ইকুইটি ফাইনান্সিং সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে হংকং, লন্ডন ও নিউইয়র্কে বেসরকারি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় দেশ-বিদেশে মোট ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা স্থগিত করা হয়েছে।
তিনি জানান, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স (এমএলএ) অনুরোধ পাঠানো হয়েছে এবং মালয়েশিয়া ও হংকংয়ের সঙ্গে এ-সংক্রান্ত চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে।
এ ছাড়া ছয়টি বড় ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং ১৫ টির বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৬০ টির বেশি গোপনীয়তা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
