কোন পে-স্কেলে কত শতাংশ বেতন বেড়েছিল, এবার কত?
বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে। নতুন বেতন কাঠামো কবে ঘোষণা হবে, কত শতাংশ বেতন বাড়বে এবং কোন গ্রেডে কী পরিবর্তন আসতে পারে—এসব প্রশ্ন ঘিরে চাকরিজীবীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
স্বাধীনতার পর থেকে দেশে এখন পর্যন্ত আটটি জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হয়েছে। সর্বশেষ বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর প্রতিবছর নির্ধারিত হারে (বর্তমানে ৫ শতাংশ) বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হলেও নতুন কোনো পে-স্কেল কার্যকর হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে বেতন বৈষম্য কমানোর প্রয়োজনীয়তা থেকেই নতুন পে-স্কেলের দাবি জোরালো হয়েছে।
নবম পে-স্কেলে কী প্রস্তাব ছিল?
২০২৫ সালের জুলাইয়ে নবম জাতীয় পে কমিশন সরকারের কাছে যে প্রতিবেদন জমা দেয়, সেখানে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়।
সেই প্রস্তাব অনুযায়ী—
সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়।
সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
তবে সরকার পরিবর্তনের পর বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য নতুন একটি কমিটি গঠন করা হয়। বর্তমানে সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত বেতন কাঠামো প্রণয়নের কাজ চলছে।
অতীতের পে-স্কেলে কত শতাংশ বেড়েছিল বেতন?
বাংলাদেশের জাতীয় পে-স্কেলের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে।
১৯৭৩ সালের প্রথম পে-স্কেল
স্বাধীনতার পর প্রথম জাতীয় পে-স্কেলে ১০টি গ্রেড চালু করা হয়। সর্বনিম্ন বেতন ছিল ১৩০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা। এটি ছিল পাকিস্তান আমলের কাঠামো থেকে সম্পূর্ণ নতুন একটি বেতন ব্যবস্থা।
১৯৭৭ সালের দ্বিতীয় পে-স্কেল
এবার গ্রেড সংখ্যা বাড়িয়ে ২১টি করা হয়। সর্বনিম্ন বেতন ১৩০ টাকা থেকে ২২৫ টাকায় উন্নীত হয়, অর্থাৎ প্রায় ৭৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। সর্বোচ্চ বেতন ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকায় উন্নীত হয়, যা ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি।
১৯৮৫ সালের তৃতীয় পে-স্কেল
এটি ছিল অন্যতম বড় বেতন বৃদ্ধি। সর্বনিম্ন বেতন ১২২ শতাংশ বেড়ে ৫০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন শতভাগ বৃদ্ধি পেয়ে ৬ হাজার টাকায় উন্নীত হয়।
১৯৯১ সালের চতুর্থ পে-স্কেল
সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন প্রায় ৬৭ শতাংশ বেড়ে ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।
১৯৯৭ সালের পঞ্চম পে-স্কেল
এই পে-স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন প্রায় ৬৭ শতাংশ বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করে ১৫ হাজার টাকা করা হয়।
২০০৫ সালের ষষ্ঠ পে-স্কেল
সর্বনিম্ন মূল বেতন ২ হাজার ৪০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ২৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। এতে সর্বনিম্ন গ্রেডে প্রায় ৬০ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে প্রায় ৫৩ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি পায়।
২০০৯ সালের সপ্তম পে-স্কেল
সর্বনিম্ন মূল বেতন বাড়িয়ে ৪ হাজার ১০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৪০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।
২০১৫ সালের অষ্টম পে-স্কেল
সবশেষ ঘোষিত পে-স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ১০১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৮ হাজার ২৫০ টাকা হয়। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ বেতন ৯৫ শতাংশ বেড়ে ৭৮ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়।
নবম পে-স্কেলের বর্তমান অগ্রগতি
অষ্টম পে-স্কেল কার্যকরের প্রায় এক দশক পর নতুন বেতন কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত নবম জাতীয় পে কমিশন ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তাদের সুপারিশ জমা দেয়। পরে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২১ এপ্রিল আরেকটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে, যা সুপারিশগুলো পুনর্বিবেচনা করছে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, নবম জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রণয়নের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেলেই নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারির প্রক্রিয়া শুরু হবে।
তিনি আরও বলেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর ঋণ কর্মসূচির কোনো সম্পর্ক নেই। তাই এ বিষয়ে সরকারের কোনো জটিলতা নেই এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন মিললেই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
