কাজের ক্লান্তি ভুলে এক মাঠে ওশান প্যারাডাইসের ৩০০ কর্মী
কেউ অতিথির কক্ষে ছুটছেন, কেউ খাবার পরিবেশনে ব্যস্ত, কারও দায়িত্ব হোটেলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তিন শিফটে চলা এমন ব্যস্ত জীবনের বাইরে কয়েক ঘণ্টার জন্য তারা নেমেছিলেন ফুটবল মাঠে। সেখানে পরিচয় বদলে গিয়েছিল। কেউ আর হাউসকিপিংয়ের কর্মী নন, কেউ নিরাপত্তাকর্মী নন, কেউবা মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা নন। সবাই তখন একই দলের খেলোয়াড়।
কক্সবাজারের তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসের কর্মীদের জন্য ফুটবল মাঠটি যেন হয়ে উঠেছিল কাজের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলার জায়গা। তিন দিন ধরে চলা আন্তঃবিভাগীয় ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে সেই আনন্দেরই পরিণতি ঘটল পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে।
শনিবার (৮ আগস্ট) সন্ধ্যায় শহরের বিজিবি ক্যাম্প সিকদারপাড়া ফুটবল এরিনায় বসেছিল ফাইনালের আসর। নির্ধারিত সময়ে ম্যাচ শেষ হয় ২-২ গোলে। এরপর ট্রাইবেকারে জয় পায় এফ অ্যান্ড বি (সার্ভিস) দল। প্রতিপক্ষ এইচআর অ্যান্ড অ্যাডমিন, আইসিটি ও সিআরএসের সমন্বিত দলকে হারিয়ে তারা ঘরে তোলে চ্যাম্পিয়নের ট্রফি। তবে মাঠের লড়াই যতটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল, আয়োজনটির গল্প তার চেয়েও বড়।
ওশান প্যারাডাইসের ডিরেক্টর আবদুল কাদের মিশুর কাছে কর্মীদের জন্য এমন আয়োজন কেবল বিনোদন নয়। তার ভাষ্য, পর্যটন শিল্পের বিকাশে হোটেলগুলো যেমন অতিথিদের সেবা দিচ্ছে, তেমনি সেই সেবার পেছনে থাকা কর্মীদের মানসিক উৎফুল্লতাও গুরুত্বপূর্ণ।
ফাইনাল শেষে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, পর্যটন একটি বিকাশমান শিল্প। কক্সবাজারের পর্যটনকে এগিয়ে নিতে সহযোগী হিসেবে কাজ করছে ওশান প্যারাডাইস। তিন শিফটে প্রায় ৩০০ কর্মী অতিথিসেবায় যুক্ত। কাজের ফাঁকে তাদের বিনোদনের ব্যবস্থা করাও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের অংশ।
সারা বছরই তাই চলে নানা আয়োজন। বার্ষিক পিকনিক, অভ্যন্তরীণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ফুটবল-ক্রিকেটসহ বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। এসব আয়োজন কর্মীদের আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি পারস্পরিক সম্পর্ক, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মনোবল বাড়ায় বলে মনে করেন তিনি।
এবারের আন্তঃবিভাগীয় ফুটবল টুর্নামেন্টে হোটেলের ডজনাধিক বিভাগ থেকে অংশ নেয় আটটি দল। নকআউট পদ্ধতিতে শুরু হওয়া প্রতিযোগিতা গড়ায় ফাইনালে। শেষ লড়াইয়ে মুখোমুখি হয় এফ অ্যান্ড বি (সার্ভিস) এবং এইচআর অ্যান্ড অ্যাডমিন, আইসিটি ও সিআরএসের সমন্বিত দল। নির্ধারিত সময়ে দুই দলই দুইবার করে জালে বল পাঠায়। ২-২ গোলে ম্যাচ শেষ হলে শিরোপা নির্ধারণ হয় ট্রাইবেকারে। সেখানেই শেষ হাসি এফ অ্যান্ড বি সার্ভিস দলের। চ্যাম্পিয়ন দলের খেলোয়াড় আজিম ও জাহাঙ্গীরের কাছে অবশ্য এই জয় শুধু একটি ট্রফি জয়ের গল্প নয়। তাঁদের কথায় উঠে আসে হোটেলের ব্যস্ত জীবনের আরেকটি চিত্র।
তারকা হোটেলে আসেন দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা। তাঁদের আরাম-আয়েশ নিশ্চিত করতে সারাক্ষণ প্রস্তুত থাকতে হয় কর্মীদের। নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, খাবার পরিবেশন, অতিথির চাহিদা পূরণ কিংবা ব্যবস্থাপনার নানা দায়িত্বে দিন কেটে যায়। তিন শিফটে কাজ করতে গিয়ে একসময় একঘেয়েমি এসে ভর করে।
আজিম ও জাহাঙ্গীর বলেন, অতিথিদের সেবা নিশ্চিত করতে গিয়ে কর্মীরা অনেক সময় ক্লান্ত ও একঘেয়ে হয়ে পড়েন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা খেলাধুলার মতো আয়োজন সেই ক্লান্তি দূর করে শরীর ও মনে নতুন সতেজতা আনে। মাঠে তখন কর্মীর পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে দলের পরিচয়।
রানার্সআপ দলের সদস্য কিশোর সুশীলের কাছে এই আয়োজনের মূল্য ট্রফির চেয়েও বেশি।
তিনি বলেন, জয়-পরাজয় মুখ্য নয়। এমন আয়োজন কর্মীদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ বাড়ায়। কাজের ব্যস্ততায় এক বিভাগের কর্মীদের সঙ্গে অন্য বিভাগের কর্মীদের নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ হয় না। কিন্তু পিকনিক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা খেলাধুলার আয়োজন সবাইকে একই জায়গায় নিয়ে আসে। সেখানে কাজের পদবি বা বিভাগের দেয়াল কিছুক্ষণের জন্য যেন অদৃশ্য হয়ে যায়।
একসঙ্গে হাসি, আনন্দ কিংবা হতাশা ভাগাভাগি করার সুযোগ তৈরি হয়। আর সেখান থেকেই তৈরি হয় একে অন্যের প্রতি নতুন আস্থা। কিশোর সুশীলের বিশ্বাস, এই সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত কর্মক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি কর্মীদের দায়িত্বশীলতা বাড়ায়।
মানবসম্পদ বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. মাহবুব ইসলাম জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও তিন দিনব্যাপী আন্তঃবিভাগীয় ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়েছে।
তার মতে, কর্মীদের বিনোদনের পাশাপাশি দলগত সম্পর্ক শক্তিশালী করাও এসব আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। ফুটবল মাঠের প্রতিযোগিতা তাই মাঠেই শেষ হয়ে যায় না। এর প্রভাব ফিরে আসে কর্মক্ষেত্রেও। একসঙ্গে খেলা, জেতা কিংবা হারার মধ্য দিয়ে সহকর্মীদের মধ্যে তৈরি হয় যোগাযোগ ও দলগত বোঝাপড়া। পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দলসহ টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া সব দলকে অভিনন্দন জানান। খেলাধুলার মাধ্যমে টিম বিল্ডিং এবং কর্মক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয় উল্লেখ করে ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে অর্থ বিভাগের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আলমগীর, বিপণন বিভাগের ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ নূর সোমেল, নিরাপত্তা বিভাগের জালাল উদ্দিন, হাউসকিপিং প্রধান মোহাম্মদ হোসাইন, আইটি কর্মকর্তা জিসানসহ বিভিন্ন বিভাগের প্রধান ও কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। দিন শেষে ট্রফি উঠেছে এফ অ্যান্ড বি সার্ভিস দলের হাতে। কিন্তু বিজয়ী যেন শুধু একটি দল নয়। তিন শিফটে কাজ করা প্রায় ৩০০ কর্মীর এই আয়োজনে জিতেছে আরও কিছু- কাজের একঘেয়েমির বিরুদ্ধে একটু আনন্দ, সহকর্মীর সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সেতু আর ব্যস্ত কর্মজীবনের ভেতর নিজেদের জন্য কিছুটা সময়।
অতিথিরা যখন হোটেলে এসে স্বস্তি খোঁজেন, তাদের সেই স্বস্তির পেছনে থাকা মানুষগুলোরও যে একটু আনন্দের প্রয়োজন- ফুটবল মাঠের এই আয়োজন যেন সেই কথাটিই মনে করিয়ে দিল।
