পরীক্ষার হলে ঢোকার আগেই এতিম, সেই নোভিদ পেল জিপিএ-৫
এক বছর আগে মাকে হারিয়েছিল জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার পলিশা গ্রামের মেধাবী কিশোর সাদিক হোসেন নোভিদ। সেই ক্ষত না শুকাতেই এসএসসির জীব বিজ্ঞান পরীক্ষার দিন সকালে ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন বাবা সুজাউদ্দিন সুজাও। বাবা-মা হারা সেই নির্মম সত্য আর শেষ বিদায়ের বুকফাটা শোক নিয়েই পরবর্তী পরীক্ষাগুলো দেয় নোভিদ। শেষ পর্যন্ত সব বাধা পেরিয়ে এক বুক কষ্টকে জয়ে পরিণত করে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে নোভিদ।
জানা গেছে, জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার আদারভিটা ইউনিয়নের পলিশা গ্রামের প্রয়াত শিক্ষক দম্পতি সুজাউদ্দিন সুজা ও কামরুন্নাহার এলিনের একমাত্র ছেলে সাদিক হোসেন নোভিদ। প্রায় বছর খানের আগে তার মা কামরুন্নাহার এলিনা অসুস্থতা জনিত কারণে মারা যান। তার মা এলিনা মেলান্দহের চরসগুনা এস এম মোখলেছুর রহমান লাভলু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা ছিলেন। মা মারা যাওয়ার পর থেকে নোভিদের দেখাশোনা তার বাবা সুজাউদ্দিন সুজা করতেন। সুজাউদ্দিন সুজা মেলান্দহ উপজেলার পলিশা উচ্চ বিদ্যালয়ের শরীর চর্চা শিক্ষক ছিলেন।
চলতি বছরের ১৯ মে রাতে নোভিদের বাবা স্ট্রোক করেন। তারপর তাকে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে এবং অবস্থার অবনতি হলে পরবর্তীতে ঢাকার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু ২০ মে সকাল ৮টার দিকে সুজাউদ্দিন সুজা মারা যায়। সেদিন নোভিদের জীববিজ্ঞান পরীক্ষা ছিল। তাই নোভিদের পরীক্ষা যেন নষ্ট না হয়, সেজন্য পরিবারের সদস্যরা নোভিদকে বাবার মৃত্যুর খবর জানাননি। এমনকি মৃত্যুর ২ ঘণ্টা পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবরটি প্রকাশ করা হয়। যাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও নোভিদ তার বাবার মৃত্যুর খবরটি জানতে না পায়। পরীক্ষা শেষে কেন্দ্র থেকে বের হয়ে নোভিদ জানতে পারে তার বাবা পৃথিবীতে নেই। তারপর বাবা মরদেহ বাড়িতে আনার পর বাবার জানাজা ও দাফন করেন নোভিদ।
জীবনের উপর দিয়ে এত বড় আচর যাওয়ার পরও থেমে থাকেনি নোভিদের পড়াশোনা। বুকের ভেতর বাবা-মা হারানোর কষ্ট নিয়েই পরবর্তী পরীক্ষা শেষ করে সে। গতকাল এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর তার ফলাফল জিপিএ-৫ আসে।নোভিদের চাচা বলেন, আমার ভাই ভাবির নোভিদকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। ছেলে অনেক বড় হবে। আজ সেই ছেলে স্বপ্ন পূরণের প্রথম সিডিটি পার হয়ে গেল। কিন্তু সেটা আমার ভাই ভাবি দেখতে পেল না। আমরা যখন শুনেছি নোভিদ জিপিএ-৫ পেয়েছে তখন বুকটা ফেটে কান্না এসেছে।
মা-বাবা হারানো নোভিদ বলেন, আজকের এই আনন্দের দিনে আমার বুকের ভেতর একটা বিশাল শূন্যতা খুব অনুভূত হচ্ছে। আমার এই রেজাল্ট দেখে সবচেয়ে বেশি যে দুটি মানুষ খুশি হতেন আব্বা-আম্মা, কিন্তু আজ তারা নেই। তাদের হাসিমুখটা দেখার সৌভাগ্য আজ আমার হলো না। সবাই আমার বাবা-মার জন্য দোয়া করবেন, আল্লাহ যেন তাদের জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করেন। আর আমার জন্যও দোয়া করবেন।
মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন চৌধুরী বলেন, নোভিদের জিপিএ-৫ অর্জনের খবর অত্যন্ত আনন্দের। উপজেলা প্রশাসন এই অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে থাকবে। তার উচ্চশিক্ষার বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হবে।
