যুক্তরাজ্যের নতুন নাম ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন’
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাজ্যকে ব্যঙ্গ করে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ঐতিহাসিকভাবে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত যুক্তরাজ্যের বিষয়ে তার এমন মন্তব্য দুই দেশের ক্রমবর্ধমান টানাপোড়েনের নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) প্রচারিত ইসরাইলি পডকাস্ট ‘মেলেখ ব্লিটজার হাইম’-এ ইসরাইল নিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের নেতিবাচক কাভারেজের সমালোচনা করতে গিয়ে নেতানিয়াহু এ মন্তব্য করেন।
১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের সময় ইসরাইলের পক্ষে ইতিবাচক সংবাদ কাভারেজের জন্য ব্রিটিশ লেখক র্যান্ডলফ চার্চিলের প্রশংসা করেন নেতানিয়াহু। এরপর তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন, বর্তমান ব্রিটেনে এ ধরনের সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। তার ভাষায়, দেশটিকে এখন ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন’ বলা যেতে পারে।
পডকাস্টে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ২০২২ সালের একটি মন্তব্যেরও উল্লেখ করেন। সে সময় ভ্যান্স সম্ভাব্য কোনো পারমাণবিক অস্ত্রধারী ‘ইসলামপন্থী দেশ’ হিসেবে যুক্তরাজ্যের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন।
নেতানিয়াহু বলেন, কেউ একজন মন্তব্য করেছিলেন যে পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রথম ইসলামি প্রজাতন্ত্র হতে পারে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন’। এরপর তিনি ইরান প্রসঙ্গে বলেন, ‘ইরানে এমন আরেকটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র তৈরি হতে দেওয়া হবে না।’
নেতানিয়াহুর মন্তব্যের সমালোচনা
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে ব্রিটিশ ও আইরিশ ইহুদি সংগঠন ‘মুভমেন্ট ফর প্রগ্রেসিভ জুডাইজম’। সংগঠনটির সহ-প্রধান রাবাই চার্লি বাগিনস্কি ও রাবাই জশ লেভ বলেন, যুক্তরাজ্যে ইহুদিবিদ্বেষ, মুসলিমবিদ্বেষ ও সামাজিক বিভাজন নিয়ে যখন মানুষের মধ্যে বাস্তব ভয় তৈরি হচ্ছে, তখন নেতানিয়াহুর এমন বক্তব্য বিপজ্জনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন।
তারা আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ব্রিটিশ ইহুদিদের হয়ে কথা বলেন না। তার বক্তব্য আমাদের প্রতিনিধিত্ব করে না।’
যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মের ডাউনিং স্ট্রিটের সাবেক চিফ অব স্টাফ গ্যাভিন বারওয়েলও নেতানিয়াহুর মন্তব্যকে সরাসরি ‘ইসলামবিদ্বেষ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, এখন আশা করা যায় সবাই সেই ভান থেকে বেরিয়ে আসবে যে নেতানিয়াহু ব্রিটেনের কোনো বন্ধু।
দুই দেশের সম্পর্কে বাড়ছে দূরত্ব
ঐতিহাসিকভাবে ইসরাইল ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও ২০২৪ সালে যুক্তরাজ্যে লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন বেড়েছে।
সাবেক লেবার প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সময়ে যুক্তরাজ্য ইসরাইলের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য আলোচনা স্থগিত করে এবং কিছু অস্ত্র রপ্তানির লাইসেন্সও স্থগিত করে। ফ্রান্সের মতো যুক্তরাজ্যও ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রিসভার সদস্য ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোটরিচের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
গত বছর যুক্তরাজ্য ফ্রান্স ও কানাডাসহ কয়েকটি মিত্র দেশের সঙ্গে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ড নিয়ে লেবার পার্টির প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি স্বীকার করেন, যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাতে দলটি অনেক দেরি করেছে।
বার্নহ্যাম আরও বলেন, গাজায় সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি অবৈধ ইসরাইলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
‘সম্পর্কের নতুন নিম্নস্তর’
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক রোদওয়ান আবুহারব মনে করেন, নেতানিয়াহুর মন্তব্য যুক্তরাজ্য-ইসরাইল সম্পর্কের ‘নতুন নিম্নস্তর’ নির্দেশ করছে। তবে তার মতে, ইরান ইস্যুতে দুই দেশের নীতিগত অবস্থানের মধ্যে এখনও উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে।
আবুহারবের ধারণা, নেতানিয়াহু হয়তো মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই এমন মন্তব্য করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি তার দুর্বল ও বিভক্ত জোট সরকারকে আরও সংহত করার চেষ্টা করতে পারেন।
গাজা যুদ্ধ, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি, ইসরাইলি বসতি ও অস্ত্র রপ্তানি নিয়ে যুক্তরাজ্য ও ইসরাইলের মতপার্থক্য যখন ক্রমেই প্রকাশ্য হচ্ছে, তখন নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কে নতুন করে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা
