বাংলাদেশে বন্ধ হচ্ছে যুক্তরাজ্য-সমর্থিত জলবায়ু প্রকল্প
যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক সহায়তা বাজেট কমানোর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু সহনশীলতা প্রকল্পে। অর্থায়ন হ্রাসের কারণে সুন্দরবনকেন্দ্রিক একটি উন্নয়ন প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুই বছর আগেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, ফলে হাজারো ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্য সরকার বৈদেশিক সহায়তা ব্যয় মোট জাতীয় আয়ের ০.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৩ শতাংশে নামানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে পরিচালিত একাধিক কর্মসূচির পাশাপাশি বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পও সংকটে পড়েছে।
ব্রিটিশ উন্নয়ন সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন ২০২৩ সাল থেকে সুন্দরবন অঞ্চলে জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে। প্রকল্পের আওতায় সৌরবিদ্যুৎ, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, জলজ চাষের প্রযুক্তি এবং ঘূর্ণিঝড় ও অতিবৃষ্টির আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পটি ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলার কথা থাকলেও সংস্থাটিকে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের মধ্যেই কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে হবে। পরে সময়সীমা কিছুটা বাড়িয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত করা হলেও নির্ধারিত মেয়াদের অনেক আগেই প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের প্রধান তামান্না রহমান জানিয়েছেন, অর্থায়ন কমে যাওয়ায় প্রকল্পের লক্ষ্য অনুযায়ী ৫৭ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। এর পরিবর্তে প্রায় ৩৭ হাজার মানুষ সহায়তা পাবেন।
তার মতে, আকস্মিক এই সিদ্ধান্ত শুধু চলমান কার্যক্রমকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা আস্থাও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। অনেক উদ্যোগ পূর্ণতা পাওয়ার আগেই থেমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবন উপকূলবর্তী অঞ্চলের মানুষ ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে তাদের জীবন-জীবিকা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে সহায়তা কমানোর বদলে আরও বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক কমিটির চেয়ার সারাহ চ্যাম্পিয়নও প্রকল্পটি আগেভাগে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, এতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদার হিসেবে দেশটির বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম জোয়ারভাটা-নির্ভর ম্যানগ্রোভ বন এবং ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী এলাকা। এখানে বসবাসকারী মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য দীর্ঘদিন ধরে বন ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবন অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বছরে প্রায় ৩ সেন্টিমিটার করে বাড়ছে, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
প্রকল্পের আওতায় গড়ে তোলা ১৪০ জন স্থানীয় উদ্যোক্তার তহবিল ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, প্রয়োজনীয় সহায়তা ও বাজারসংযোগ না পেলে এসব উদ্যোগ টেকসই হবে না।
এদিকে উন্নয়নকর্মীরা বলছেন, প্রকল্প বন্ধের ঘোষণায় স্থানীয় অনেক মানুষ হতাশ হয়ে পড়েছেন। কারণ বিভিন্ন কর্মসূচির ইতিবাচক ফল দৃশ্যমান হতে শুরু করার সময়ই সহায়তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় ধারাবাহিক ও স্থায়ী অর্থায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও অভিযোজন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
