মূল লেখায় যান
সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৪:৪১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
সিএমপি'র পাঁচ থানার ওসি পদে রদবদল এইমাত্রঅন্যান্য সিএমপি'র পাঁচ থানার ওসি পদে রদবদল ইসরায়েল পরমাণু অস্ত্র ধ্বংস করলেই অঞ্চলে শান্তি আসবে এইমাত্রঅন্যান্য ইসরায়েল পরমাণু অস্ত্র ধ্বংস করলেই অঞ্চলে শান্তি আসবে রেসিং ট্র্যাকে ভয়াবহ দুর্ঘটনা, কেমন আছেন অজিত কুমার এইমাত্রঅন্যান্য রেসিং ট্র্যাকে ভয়াবহ দুর্ঘটনা, কেমন আছেন অজিত কুমার ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী এইমাত্রঅন্যান্য ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে বন্ধ হচ্ছে যুক্তরাজ্য-সমর্থিত জলবায়ু প্রকল্প এইমাত্রঅন্যান্য বাংলাদেশে বন্ধ হচ্ছে যুক্তরাজ্য-সমর্থিত জলবায়ু প্রকল্প সীতাকুণ্ডে জাহাজ ভাঙার দুর্ঘটনায় নিহত ১০ শ্রমিকের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান এইমাত্রঅন্যান্য সীতাকুণ্ডে জাহাজ ভাঙার দুর্ঘটনায় নিহত ১০ শ্রমিকের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান ইরানের রাস্তায় হিজাব ছেড়ে খোলা চুলে নারীরা, বেকায়দায় সরকার এইমাত্রঅন্যান্য ইরানের রাস্তায় হিজাব ছেড়ে খোলা চুলে নারীরা, বেকায়দায় সরকার ২ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব বণ্টন, পরিপত্র জারি এইমাত্রঅন্যান্য ২ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব বণ্টন, পরিপত্র জারি
অন্যান্য

ইরানের রাস্তায় হিজাব ছেড়ে খোলা চুলে নারীরা, বেকায়দায় সরকার

প্রতিবেদক:
ইরানের রাস্তায় হিজাব ছেড়ে খোলা চুলে নারীরা, বেকায়দায় সরকার

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তীব্র সংঘাতে লিপ্ত থাকার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে একটি পরিচিত লড়াইয়ের মুখোমুখি হচ্ছে ইরান। সেটি হচ্ছে ক্রমবর্ধমান হারে দেশটির নারীরা প্রকাশ্যে হিজাব পরতে অস্বীকৃতি জানালেও সরকার এই বিষয়ে তেমন কঠোর কোনও অবস্থানে যাচ্ছে না।

যুদ্ধের ভয়াবহ সময়েও সরকারপন্থি জনসভা এবং রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে হিজাবহীন নারীদের দেখা গেছে। একটি ভিডিওতে জাতীয় পতাকা হাতে এক হিজাবহীন নারীকে বলতে শোনা যায়, তার স্বামী সেনাবাহিনীতে কর্মরত এবং স্বামীকে নিয়ে গর্বিত তিনি।

যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট এবং মোজতবা খামেনির অধীনে নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্গঠন নিয়ে ব্যস্ত থাকা কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে নারীদের পোশাক সংক্রান্ত নিয়ম কঠোরভাবে চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টি যেন কিছুটা থমকে গেছে। বর্তমানে ইরানের কট্টরপন্থিরা বিষয়টিকে আবারও অগ্রাধিকারের তালিকার শীর্ষের কাছাকাছি ফিরিয়ে আনতে চান।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতা এবং রাজনীতিকরা ‘‘প্রকাশ্য নগ্নতার’’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। একই সঙ্গে পোশাকের নিয়ম মানতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্যাফে ও অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।

কিন্তু সরকার এক বিস্ফোরক হিসেব-নিকেশের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে: ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর হওয়া এক বিষয়, আর বিপুল সংখ্যক নারীর মুখোমুখি হতে নীতি পুলিশকে আবারও রাস্তায় নামানো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

মাহসা আমিনির মৃত্যু দেশটিতে ‘নারী, জীবন, স্বাধীনভাবে চলার’ অভ্যুত্থানের দাবানল জ্বালিয়ে দেওয়ার চার বছর পর অনেক ইরানি নারী প্রকাশ্যে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন অমান্য করছেন। আর তেহরান নতুন সংঘাতময় পরিস্থিতি এড়াতে চাইছে।

• হিজাব থেকে মাহসা আমিনি: যেভাবে আজকের ইরান

• ১৯৭৯ : বিপ্লবের পথ পরিবর্তন

ইসলামি বিপ্লবে শাহর পতনের পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনি নারীদের ইসলামি পোশাক মেনে চলার আহ্বান জানান। নারীরা বাধ্যতামূলকভাবে পর্দা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার প্রতিবাদ করেন।

• ১৯৮০-এর দশকের শুরু : বাধ্যতামূলক হিজাব

ইরানে পর্যায়ক্রমে কর্মক্ষেত্র ও সরকারি স্থানগুলোতে বাধ্যতামূলক ইসলামি পোশাক চালু করে। নির্ধারিত ইসলামি হিজাব ছাড়া জনসমক্ষে আসা নারীরা ইরানি আইনের আওতায় শাস্তির যোগ্য হন।

• ২০০০-এর দশক : নীতি পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি

নীতি পুলিশ হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত ইরানের ‘গাইডেন্স পেট্রোল’ নারীদের পোশাক সংক্রান্ত নিয়ম প্রয়োগের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়। অনুচিতভাবে হিজাব পরা নারীদের তারা থামাত এবং আটক করত।

• ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২ : মাহসা আমিনিকে আটক

নীতি পুলিশ অনুপযুক্ত হিজাব পরার অভিযোগে ২২ বছর বয়সী কুর্দি-ইরানি নারী মাহসা আমিনিকে তেহরান থেকে আটক করে।

• ১৬ সেপ্টেম্বর : আমিনির মৃত্যু

পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় মারা যান ইরানি এই তরুণী। দেশটির কর্তৃপক্ষ জানায়, তার মৃত্যু স্বাভাবিক কারণে হয়েছে। তবে জাতিসংঘের একটি তদন্ত দল বেআইনি বল প্রয়োগে আমিনি মারা গেছেন বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। রাষ্ট্রীয় হেফাজতে শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়ে মারা যান তিনি।

• ২০২২-২৩ :  ‘নারী, জীবন, স্বাধীনভাবে চলা’ আন্দোলনের বিস্ফোরণ

তার মৃত্যু দেশজুড়ে বিক্ষোভের জন্ম দেয়। বিক্ষোভ যত ছড়িয়ে পড়তে থাকে, নারীরা তত তাদের মাথার স্কার্ফ খুলে আগুন ধরিয়ে দিতে থাকেন এবং এটি ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এক ব্যাপক চ্যালেঞ্জে রূপ নেয়।

• ৫৫০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারী নিহত

জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির এক প্রতিবেদনে বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনীর অপ্রয়োজনীয় ও প্রাণঘাতী বল প্রয়োগে অন্তত ৬৮ শিশুসহ ৫৫০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। এই অস্থিরতার সময়ে হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়।

• ২০২৪ : কঠোর আইন স্থগিত

ইরান হিজাব লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি এবং নজরদারির বিধান রেখে একটি আইন অনুমোদন করে। কিন্তু সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপে এর বাস্তবায়ন স্থগিত করা হয়।

• ২০২৬ : যুদ্ধ বদলে দিয়েছে হিসাব-নিকাশ

যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক চাপে জর্জরিত থাকায় ইরানে হিজাবহীন নারীদের উপস্থিতি ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। কট্টরপন্থিরা নতুন করে আইন প্রয়োগের দাবি জানাচ্ছেন।  তবে কর্তৃপক্ষ মাহসা আমিনির মতো আরেকটি সংঘাতের জন্ম দিতে অনিচ্ছুক বলে ধারণা করা হচ্ছে।

• নারীদের মুখোমুখি না হয়ে দমন-পীড়ন
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ বলেছে, বাধ্যতামূলক হিজাব আইন না মানায় ১৯ জুলাই তেহরানে অন্তত সাতটি ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সামাজিক আদর্শ ও বাধ্যতামূলক হিজাব বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে দক্ষিণ খোরসান প্রদেশেও ১০টি ক্যাফে বন্ধ করে দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

কট্টরপন্থিরা দেশটির কর্তৃপক্ষকে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কট্টরপন্থি কায়হান পত্রিকার সম্পাদক হোসেইন শরীয়তমাদারি যুক্তি দিয়েছেন, হিজাব বিধি প্রয়োগ করা আইনি বাধ্যবাধকতা এবং ধর্মীয় দায়িত্ব।

ইসফাহানের এক সমাবেশে এক প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, নেতানিয়াহু: হিজাবহীন নারীরা আমাদের জন্য বিনামূল্যের সৈনিক।

• পিছু হটছেন না নারীরা
তবুও ইরানের রাস্তার পরিস্থিতি একদম উল্টো। সামাজিক যোগাযোাগ মাধ্যমের ভিডিওতে দেখা যায়, তরুণীরা হেলমেট পরে থাকলেও মাথায় স্কার্ফ ছাড়া স্কুটার চালিয়ে তেহরান ও অন্যান্য শহর পাড়ি দিচ্ছেন।

তেহরানের ষাটোর্ধ্ব এক নারী সিএনএনকে বলেন, কর্তৃপক্ষ এখনও নারীদের সরাসরি মুখোমুখি হতে দ্বিধাগ্রস্ত বলে মনে হচ্ছে। তারা এখনও রাস্তার মানুষকে কিছু বলার সাহস পায় না। তেহরানের মেয়েরা ক্রপ টপ, শর্টস এবং সব ধরনের পোশাক পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর মাথার স্কার্ফ কার্যত অতীত হয়ে গেছে।

‘‘আমি মনে করি না তারা এই মেয়েদের দিয়ে আবার মাথায় স্কার্ফ পরাতে পারবে। তবে আবার ভেবে দেখলে, বিপ্লবের সময়ও আমরা ঠিক এটাই ভেবেছিলাম। আমরা কখনোই ভাবিনি আমাদের এটি পরতে বাধ্য করতে পারবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা পেরেছিল।’’

• পেজেশকিয়ানের বাধা
বাধ্যতামূলক কঠোরতার মাধ্যমে আচরণের পরিবর্তন আনা সম্ভব কি না, সেই বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও। নিজের মেয়ের সঙ্গে মতভেদের কথা উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন করেন, এর অর্থ কি আমার তাকে জোর করা উচিত?

‘‘আচরণের পরিবর্তন একটি সাংস্কৃতিক বিষয়; এটি বিশ্বাসের বিষয়। শক্তি প্রয়োগ করে আপনি মানুষের মনে বিশ্বাস তৈরি করতে পারেন না।’’

দেশটির সাবেক সংসদ সদস্য গোলামআলী জাফরজাদেহ ইমানাবাদী বলেন, কর্মকর্তাদের বরং মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার দিকে নজর দেওয়া উচিত। যুদ্ধের সময়ে এই যুক্তির গুরুত্ব অনেক বেশি। ইরান একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের অর্থনৈতিক পরিণতি সামলাচ্ছে। অন্যদিকে এই যুদ্ধকে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করছে। নিজ দেশে নারীদের বিরুদ্ধে নতুন আরেকটি ফ্রন্ট খুলে বসার স্পষ্ট ঝুঁকি রয়েছে।

• যে লড়াইয়ের কথা মনে রেখেছে তেহরান
শাসকগোষ্ঠীর সতর্ক হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ২২ বছর বয়সী কুর্দি-ইরানি তরুণী মাহসা আমিনিকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে হিজাব না পরার অভিযোগে তেহরান থেকে আটক করে ইরানের নীতি পুলিশ। তিন দিন পর তার মৃত্যু হয়।

তার মৃত্যু ‘‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’’ স্লোগানে ইরানজুড়ে বিক্ষোভের জন্ম দেয়; যা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটিতে পরিণত হয়।

বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীরা মাথার স্কার্ফ খুলে পুড়িয়ে দেন এবং চুল কেটে ফেলেন। আন্দোলন নির্মমভাবে দমন করা হলেও হিজাব আইনের প্রতি ব্যাপক অমান্য করার প্রবণতা স্থায়ী রূপ নেয়।

ইরানের ইসলামিক প্যানাল কোডের ৬৩৮ অনুচ্ছেদে ইসলামি হিজাব ছাড়া নারীদের জনসমক্ষে আসাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ২০২৪ সালে অনুমোদিত এক কঠোর আইনে জরিমানা ও নজরদারি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপে এর বাস্তবায়ন স্থগিত হয়ে যায়।

সেই পিছু হটা কট্টরপন্থিদের ক্ষুব্ধ করেছে।

সংসদ সদস্য মোহাম্মদ-তাকি নকদালি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইসরায়েল ও আমেরিকা আমাদের ধ্বংস করতে পারবে না। কিন্তু যে ক্ষয় আমাদের ধর্মীয় সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরেছে এবং সমাজে যেভাবে বিপর্যয়কর ও ব্যাপকভাবে নগ্নতা ছড়িয়ে দিচ্ছে, তা আমাদের ধ্বংস করে দেবে।

ইরানের কট্টরপন্থিদের কাছে হিজাবের লড়াইও এক অস্তিত্বের লড়াই। কিন্তু ইতোমধ্যে বিদেশে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং নতুন করে অস্থিরতার ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়া একটি সরকারের কাছে, এই নিয়ম কার্যকর করতে এমন মূল্য চোকাতে হতে পারে যা তারা এখনও দিতে প্রস্তুত নয়। আপাতত তেহরান যেন পরখ করে দেখছে; ইরানের নারীদের আবারও রাজপথে না নামিয়ে কতদূর পর্যন্ত বলপ্রয়োগ করা যায়।

সূত্র: সিএনএন, এএফপি।