আমার ছেলেকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিন: গুম হওয়া মিরাজ শেখের মা
মোল্লার নিখোঁজ ছেলে মিরাজ শেখের সন্ধান ও তাকে দ্রুত পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (২৪ আগস্ট) জাতীয় প্রেস ক্লাবে এইচআরএসএস, ব্লাট ও ভুক্তভোগী পরিবারের উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মিরাজের পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা এ দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলার জিউধরা এলাকার বাসিন্দা মিরাজ শেখ গত ১০ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায় মোড়েলগঞ্জের স্থানীয় একটি দোকান থেকে মিরাজকে দুই যুবক সাদা পোশাকধারী কোস্ট গার্ড সদস্য পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাকে কোস্ট গার্ডের একটি দলের সঙ্গে দেখা যায় এবং তার ছবি ও ভিডিও ধারণ করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি মিরাজের স্ত্রী দিনারাজের সামনেই ঘটে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
পরিবারের দাবি, প্রায় ১১ দিন পর গভীর রাতে মিজান মাহমুদসহ দুজন কোস্ট গার্ড সদস্য পটুয়াখালী থেকে বের হয়ে এসে মিরাজের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি নিয়ে যায়। এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে স্থানীয় থানাসহ বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করা হয়। ২৩ এপ্রিল মোড়েলগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, ১০, ১১ ও ১২ এপ্রিল কোস্ট গার্ডের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের একাধিকবার কথা হয়। তারা মিরাজকে হেফাজতে থাকার কথা স্বীকার করে বলে অভিযোগ পরিবারের। এমনকি ২-৩ দিনের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে মিরাজের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
নিখোঁজের ঘটনায় পরিবার প্রায় সাড়ে চার মাস ধরে মোড়েলগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি, কোস্ট গার্ড কার্যালয়ে যোগাযোগ, সংবাদ সম্মেলন এবং সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন করেছে। পরে হাইকোর্ট গত ১২ জুলাই ২০২৬ তারিখে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে নিখোঁজ মিরাজ শেখকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন। তবে পরিবারের অভিযোগ, কোস্ট গার্ড কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই আটকের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে এবং এখন পর্যন্ত মিরাজের কোনো হদিস মেলেনি।
এদিকে মিরাজের সন্ধানের দাবিতে আয়োজিত একটি শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, ব্যানার-ফেস্টুন কেড়ে নেওয়া এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার অভিযোগও করা হয়। পরবর্তীতে মিরাজকে ফেরত ও সিসিটিভি ফুটেজ যাচাইয়ের দাবিতে পরিবার ও গ্রামবাসী কোস্ট গার্ডের কাছে গেলে তাদের ওপর লাঠিচার্জের অভিযোগ ওঠে। এতে কয়েকজন আহত হন এবং মিরাজের মা, বোন ও স্ত্রীকেও আটক করা হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়।
মিরাজের পরিবার দ্রুত তার সন্ধান নিশ্চিত করে তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এর পরিচালকবৃন্দ, উপস্থিত এডভোকেট এবং সমাজকর্মীরা বলেন, আমাদের সংগৃহীত তথ্যমতে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এই ঘটনাটি বাংলাদেশে সংঘটিত প্রথম গুমের ঘটনা যেখানে কোস্টগার্ড কর্তৃক মিরাজ শেখকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সর্বশেষ কোস্টগার্ডের হেফাজতেই দেখা গিয়েছিল।
আমরা তাই রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোরালো আবেদন জানাচ্ছি—
• অবিলম্বে হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী মিরাজ শেখকে জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করতে হবে।
• দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, মিরাজ শেখকে সূনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে এখতিয়ার সম্পন্ন আদালতে প্রেরণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা করা হয়নি, এরূপ আইনগত প্রক্রিয়া প্রতিপালনে ব্যর্থতার জন্য সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
• যদি মিরাজ শেখের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থেকে থাকে, তবে তাকে দেশের প্রচলিত আইনে, প্রকাশ্য বিচার প্রক্রিয়ায় আদালতে সোপর্দ করতে হবে — বিনা বিচারে আটক বা নির্যাতনের অধিকার কারও নেই।
• এই ঘটনায় জড়িত কোস্ট গার্ডের সংশ্লিষ্ট সকল সদস্যের বিরুদ্ধে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
• ভুক্তভোগী পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা কোনো হুমকি বা হয়রানির শিকার না হন।
• কোন ব্যক্তিকে আটক করার ক্ষেত্রে ফৌজদারী কার্যবিধির বিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তার পরিচয় প্রকাশ করে আটকের কারণ উল্লেখসহ আটককৃত ব্যক্তির পরিবার বা আত্নীয়কে জানাতে হবে- এ বিষয়ে আইন প্রয়োগকারী সদস্যদেরকে পর্যাপ্ত সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
• গুম প্রতিরোধে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আরও শক্তিশালী করা এবং স্বাধীনভাবে তদন্তের ক্ষমতা প্রদান করতে হবে।
