পুরুষের তুলনায় নারীদের মাইগ্রেন বেশি কেন? জানুন এর পেছনের কারণ
মাসের নির্দিষ্ট সময় এলেই মাথাব্যথা শুরু হয়। কখনও আলো সহ্য হয় না, কখনও শব্দে অস্বস্তি লাগে। সঙ্গে থাকতে পারে বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা কিংবা মনোযোগ ধরে রাখতে না পারার সমস্যা। অনেক নারীর কাছে মাইগ্রেন তাই শুধু একটি মাথাব্যথা নয়, বরং স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে দেওয়া এক দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুষের তুলনায় নারীদের মধ্যে মাইগ্রেনের প্রবণতা অনেক বেশি। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারীদের মাইগ্রেনে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। বিশ্বজুড়ে প্রতি সাতজন মানুষের মধ্যে একজন কোনো না কোনো সময় মাইগ্রেনে ভোগেন।
কিন্তু কেন নারীদের মধ্যেই এই সমস্যা বেশি দেখা যায়?
মাইগ্রেনকে সাধারণত একটি জেনেটিক ও স্নায়বিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ অবস্থায় মস্তিষ্ক বিভিন্ন পরিবর্তন ও উদ্দীপকের প্রতি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। নির্দিষ্ট কিছু স্নায়ুপথ সক্রিয় হলে মাইগ্রেনের আক্রমণ শুরু হতে পারে। তবে সবার ক্ষেত্রে কারণ এক নয়। যে বিষয়টি একজনের মাইগ্রেনের কারণ হতে পারে, অন্যজনের ক্ষেত্রে সেটি কোনো প্রভাবই ফেলতে নাও পারে।
নারীদের ক্ষেত্রে হরমোন কেন বড় ভূমিকা রাখে?
শৈশবে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে মাইগ্রেনের হার প্রায় একই রকম থাকে। কিন্তু বয়ঃসন্ধির পর, বিশেষ করে মাসিক শুরু হওয়ার পর অনেক নারীর মধ্যে মাইগ্রেনের প্রবণতা বাড়তে দেখা যায়। এর প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয় ইস্ট্রোজেন হরমোনের ওঠানামাকে। মাসিক শুরুর আগে শরীরে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা দ্রুত কমে যায়, যা অনেক নারীর ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের আক্রমণকে উসকে দিতে পারে।
এ ছাড়া মেনোপজের আগের সময়, অর্থাৎ পেরিমেনোপজেও হরমোনের পরিবর্তন দ্রুত ঘটে। ফলে এ সময় অনেক নারী তীব্র মাইগ্রেনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। তবে মেনোপজের পর হরমোন তুলনামূলক স্থিতিশীল হয়ে গেলে অনেকের ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের তীব্রতা ও আক্রমণের সংখ্যা কমে আসে।
জীবনযাপনের অভ্যাসও দায়ী
শুধু হরমোন নয়, দৈনন্দিন জীবনযাপনের নানা বিষয়ও মাইগ্রেনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অনেক সময় একটি নয়, বরং একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কম ঘুম, অতিরিক্ত ঘুম, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, রক্তে শর্করার ওঠানামা এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপ মাইগ্রেনের সাধারণ ট্রিগারগুলোর মধ্যে অন্যতম।
তাই প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া এবং নিয়মিত খাবার খাওয়ার অভ্যাস মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
পানিশূন্যতাও হতে পারে কারণ
অনেকেই ব্যস্ততার কারণে পর্যাপ্ত পানি পান করেন না। কিন্তু শরীরে পানির ঘাটতি হলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মাথাব্যথা ও মাইগ্রেনের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায় বা অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে পানি বের হয়ে গেলে এ সমস্যা আরও প্রকট হতে পারে। তাই সারা দিনে পর্যাপ্ত পানি পান করা গুরুত্বপূর্ণ।
মানসিক চাপের সঙ্গে রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক
কর্মক্ষেত্র, পরিবার এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা দায়িত্বের চাপ অনেকের জন্যই মাইগ্রেনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মজার বিষয় হলো, শুধু চাপের সময় নয়; দীর্ঘদিনের ব্যস্ততা বা মানসিক চাপে থাকার পর হঠাৎ অবসর বা স্বস্তির সময়ও অনেকের মাইগ্রেন শুরু হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে অনেক সময় ‘উইকএন্ড মাইগ্রেন’ বলেও উল্লেখ করা হয়।
তাই নিয়মিত বিশ্রাম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা প্রয়োজন।
আবহাওয়ার পরিবর্তনেও বাড়তে পারে সমস্যা
তাপমাত্রা, আর্দ্রতা বা বায়ুচাপের দ্রুত পরিবর্তনও মাইগ্রেনের একটি পরিচিত ট্রিগার। আবহাওয়ার হঠাৎ পরিবর্তনের সময় অনেকের মাথাব্যথা বেড়ে যেতে দেখা যায়। এ ছাড়া আয়রনের ঘাটতি, থাইরয়েডের সমস্যা কিংবা সিলিয়াক রোগের মতো কিছু শারীরিক অবস্থার সঙ্গেও মাইগ্রেনের সম্পর্ক থাকতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
নিজের ট্রিগার চিহ্নিত করবেন কীভাবে?
মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো নিজের ট্রিগারগুলো শনাক্ত করা। কখন মাথাব্যথা শুরু হচ্ছে, তার আগে কতক্ষণ ঘুমিয়েছেন, কী খেয়েছেন, কতটা পানি পান করেছেন, মানসিক চাপের মাত্রা কেমন ছিল বা মাসিক চক্রের কোন পর্যায়ে ছিলেন—এসব তথ্য লিখে রাখা যেতে পারে। কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে নোট রাখলে কোন বিষয়গুলো বারবার মাইগ্রেনের আগে ঘটছে, তা সহজেই বোঝা সম্ভব।
মাইগ্রেন বারবার হলে, ব্যথার তীব্রতা হঠাৎ বেড়ে গেলে অথবা দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কারণ সব ধরনের মাথাব্যথা মাইগ্রেন নয়। কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী বা অস্বাভাবিক মাথাব্যথা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যারও ইঙ্গিত হতে পারে। তাই উপসর্গকে অবহেলা না করে প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
