আমরা কি ধীরে ধীরে বই পড়ার অভ্যাস হারিয়ে ফেলছি?
বইয়ের পাতা উল্টে গল্পের গভীরে ডুবে থাকা কিংবা অবসরে প্রিয় বইটি হাতে তুলে নেওয়ার অভ্যাস কি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে? এখন মুঠোফোনেই পাওয়া যায় খবর, বিনোদন ও নানা ধরনের তথ্য। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও কিংবা ছোট পোস্টেই মিলছে বিভিন্ন বিষয়ের সারসংক্ষেপ। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বই পড়ার ধৈর্য ও মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে আসছে।
বই অবশ্য হারিয়ে যায়নি। ছাপা বইয়ের পাশাপাশি ই-বুক ও অডিওবুকের জনপ্রিয়তাও রয়েছে। তবে পড়ার উপকরণ সহজলভ্য হওয়া আর নিয়মিত পড়ার অভ্যাস ধরে রাখা এক বিষয় নয়। ডিজিটাল বিনোদনের বিস্তারে অবসর কাটানোর ধরন বদলেছে, আর বই পড়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা বেড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিওর।
ছোট ভিডিও কি মনোযোগে প্রভাব ফেলছে?
২০২৫ সালে Psychological Bulletin সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে ৭১টি গবেষণার ফলাফল পর্যালোচনা করা হয়। এতে ৯৮ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও ব্যবহারের সঙ্গে মনোযোগসহ কিছু জ্ঞানীয় সক্ষমতার দুর্বল সম্পর্ক পাওয়া যায়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ভিডিও দেখলেই মস্তিষ্কের ক্ষতি হয়। গবেষণাটি সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়েছে, কিন্তু ভিডিও ব্যবহারের কারণেই মনোযোগ কমছে কি না, তা নিশ্চিত করেনি। এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, বই পড়ার সময় পাঠককে গল্পের চরিত্র, ঘটনার ধারাবাহিকতা ও বিষয়বস্তু বুঝতে মনোযোগ দিতে হয়। প্রয়োজনে একই অংশ আবার পড়া কিংবা থেমে ভাবার সুযোগও থাকে। নিয়মিত পড়ার অভ্যাস তাই দীর্ঘ লেখা বোঝা ও বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বই পড়ার অভ্যাস গড়বেন যেভাবে
বই পড়ার জন্য শুরুতেই বড় উপন্যাস হাতে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ছোটগল্প, কবিতা, ইতিহাস, বিজ্ঞান, জীবনী কিংবা নিজের পছন্দের যেকোনো বিষয় দিয়ে শুরু করা যায়। প্রতিদিন কয়েক পৃষ্ঠা পড়া কিংবা নির্দিষ্ট কিছু সময় ফোনের নোটিফিকেশন বন্ধ রেখে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার কার্যকর উপায় হতে পারে।
শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রেও তাদের আগ্রহ অনুযায়ী বই বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে বই পড়ার পরিবেশ তৈরি করা, একসঙ্গে গল্প পড়া এবং পড়া বিষয় নিয়ে আলোচনা তাদের আগ্রহ বাড়াতে পারে। পাশাপাশি বিদ্যালয় ও স্থানীয় পর্যায়ে গ্রন্থাগারের সুযোগ বাড়ানোও জরুরি।
প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। মুঠোফোনে ই-বুক পড়া কিংবা অডিওবুক শোনার মাধ্যমেও বইয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকা সম্ভব। মূল বিষয় হলো, ডিজিটাল বিনোদনের পাশাপাশি পড়ার জন্যও সময় রাখা।
বই হয়তো হারিয়ে যাচ্ছে না; বরং তথ্য ও বিনোদনের উৎস বেড়ে যাওয়ায় বইয়ের জন্য সময় বের করা কঠিন হয়ে উঠছে। প্রতিদিন অল্প কিছু সময় বই পড়ার অভ্যাস সেই দূরত্ব কমাতে পারে। কারণ, দ্রুত তথ্য পাওয়ার সুবিধার পাশাপাশি কোনো বিষয় গভীরভাবে বোঝা এবং মনোযোগ দিয়ে পড়ার অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।
