মূল লেখায় যান
শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
অন্যান্য

বিশ্ববাজারে ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ তেলের দাম

প্রতিবেদক:
বিশ্ববাজারে ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ তেলের দাম

ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী জাহাজে বিস্ফোরক হামলার ঘটনা বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের ডিসেম্বর মাসের চুক্তির দাম ব্যারেলপ্রতি ২ দশমিক ৭৬ ডলার বা ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ১১৭ দশমিক ৬৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। লেনদেনের একপর্যায়ে দাম ১১৮ ডলারে পৌঁছায়। তবে ডিসেম্বরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় বেশি সক্রিয় জানুয়ারির চুক্তির দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৪৩ ডলারে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ২ দশমিক ১২ ডলার বা ২ দশমিক ০৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৪ দশমিক ১২ ডলারে লেনদেন শেষ করেছে।

পুরো অক্টোবর মাসে ব্রেন্টের দাম বেড়েছে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সময়ে ডব্লিউটিআইয়ের দাম বেড়েছে ১৫ দশমিক ২ শতাংশ।

হরমুজ প্রণালিতে ট্যাংকারে বিস্ফোরক হামলা
তেলের বাজারে উদ্বেগ বাড়ানোর অন্যতম কারণ হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী জাহাজে হামলা। শুক্রবার যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানায়, একটি ছোট নৌযান থেকে জাহাজটির গায়ে বিস্ফোরক লাগানো হয়েছিল।

হামলার সঙ্গে কারা জড়িত, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে সামুদ্রিক সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালিতে লিমপেট মাইন ব্যবহার করে এটিই প্রথম সফল হামলা বলে জানা গেছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়। ফলে এ পথে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিওকে ফাইন্যান্সিয়ালের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেনিস কিসলার বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রবাহিনীর সম্ভাব্য সামরিক তৎপরতার দিকে ব্যবসায়ীরা নজর রাখবেন।

সৌদি আরবে মার্কিন কর্মীদের দেশ ছাড়ার নির্দেশ
মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়তে থাকায় সৌদি আরব থেকে জরুরি নয় এমন মার্কিন সরকারি কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত ২৩ অক্টোবর থেকে এ নির্দেশ কার্যকর হয়েছে বলে শুক্রবার রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে।

বেসামরিক বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হুতিদের হামলার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের কয়েকটি স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে রাস তানুরা তেল শোধনাগার, রাবিগ শোধনাগার এবং সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর আবকাইক উৎপাদন স্থাপনা।

এদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন একটি জোট জানিয়েছে, দেশটির পশ্চিমাঞ্চল লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তারা প্রতিহত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় মধ্যস্থতা করছে কাতার
সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা শুক্রবার আবারও তেহরানে ফিরেছেন বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন আলোচনার বিষয়ে অবগত এক কর্মকর্তা।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার জানান, ইরানকে চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহে সহায়তার বিষয়ে দেশটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।

ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, ভ্যান্সের পাঠানো একটি চিঠি তেহরান পেয়েছে। তবে এখনো এর জবাব দেওয়া হয়নি। ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের শর্ত পূরণ করতে হবে।

নভেম্বরের নির্বাচন ঘিরে বাড়তে পারে অস্থিরতা
তেলের বাজারে আগামী কয়েক সপ্তাহে আরও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্যাক্সো ব্যাংক। ব্যাংকটির বৃহস্পতিবারের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক নির্বাচন এবং আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।

প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, সংঘাত শেষ হলেও অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে থাকতে পারে। যুদ্ধ শুরুর আগে এ দাম ছিল ৬০ থেকে ৭০ ডলারের মধ্যে।

সৌদি আরবের তেল রপ্তানি বেড়েছে, লিবিয়ায় সরবরাহ বন্ধ
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও অক্টোবরে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি সেপ্টেম্বরের তুলনায় বেড়েছে বলে জানিয়েছে তিনটি জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটি।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ভবিষ্যৎ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ সূচক তেল রিগের সংখ্যা দুইটি বেড়েছে। দেশটির জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ) জানিয়েছে, আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের উৎপাদন বাড়লেও অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের চাহিদা কমেছে।

এদিকে লিবিয়ার ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশন জানিয়েছে, শুক্রবার একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাদা অপরিশোধিত তেলক্ষেত্র থেকে জাওইয়া শোধনাগারে সংযুক্ত প্রধান পাইপলাইনের একটি ভালভ বন্ধ করে দিয়েছে। এতে প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার ব্যারেল তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে হামলা এবং সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে।