মূল লেখায় যান
বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১:৫৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম
অন্যান্য

পথশিশু নয়, পথের স্বপ্ন-শাকিলা বর্ষা

প্রতিবেদক:
পথশিশু নয়, পথের স্বপ্ন-শাকিলা বর্ষা

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। শহরের রাস্তাগুলোতে যানবাহনের চাপ বাড়তে শুরু করেছে। এরই মধ্যে ফুটপাত থেকে উঠে পড়েছে কয়েকজন শিশু। কারও হাতে ফুল, কেউ পানির বোতল বিক্রি করছে, আবার কেউ বস্তা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে পরিত্যক্ত কাগজ ও প্লাস্টিক সংগ্রহ করতে। অন্য শিশুদের জন্য দিনটি হতে পারে স্কুল, খেলাধুলা আর বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দের সময়। কিন্তু এই শিশুদের দিনের শুরু হয় জীবিকার সন্ধানে।

প্রতিদিন শহরের ব্যস্ত রাস্তায় দেখা যায় অসংখ্য শিশুকে। কেউ ফুল বিক্রি করে, কেউ পুরোনো কাগজ ও প্লাস্টিক সংগ্রহ করে, আবার কেউ পথচারীদের কাছে ছোটখাটো পণ্য বিক্রি করে। ব্যস্ত শহরের কোলাহলের আড়ালে তাদের জীবন যেন এক নীরব গল্প হয়ে চলতে থাকে।

আমরা সাধারণত তাদের ‘পথশিশু’ নামে চিনি। কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালে রয়েছে তাদের নিজস্ব স্বপ্ন, সংগ্রাম, আশা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা আকাঙ্ক্ষা।

শৈশব যখন দায়িত্বের কাছে হার মানে

শৈশব হওয়ার কথা শিক্ষা, খেলাধুলা, পরিবার ও আনন্দের সময়। কিন্তু দারিদ্র্য ও পারিবারিক সংকট অনেক শিশুকে স্বাভাবিক শৈশব থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। পরিবারের আর্থিক চাহিদা মেটাতে অল্প বয়সেই তাদের কাজে নামতে হয়।

দিন শেষে তারা যে সামান্য অর্থ উপার্জন করে, তা অনেক সময় পরিবারের খাবার ও দৈনন্দিন খরচ মেটাতে ব্যবহৃত হয়। ফলে স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

বইয়ের বদলে হাতে কাজ

শিক্ষা একটি শিশুর ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। কিন্তু অনেক পথশিশুর কাছে স্কুল এখনো একটি দূরের স্বপ্ন। কেউ কখনো স্কুলে যাওয়ার সুযোগই পায়নি, আবার কেউ পারিবারিক সমস্যার কারণে কিছুদিন পড়াশোনা করার পর তা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।

স্কুলগামী শিশুদের বই ও স্কুলব্যাগ হাতে দেখে অনেক পথশিশুর মধ্যেও পড়াশোনার আগ্রহ তৈরি হয়। তাদেরও বই হাতে নেওয়ার ইচ্ছা থাকে। কিন্তু জীবনের কঠিন বাস্তবতা অনেক সময় তাদের হাতে বইয়ের পরিবর্তে কাজের সরঞ্জাম তুলে দেয়।

তবুও সুযোগ পেলে তারাও পড়তে চায়। তাদের অনেকের স্বপ্ন—একদিন ভালো চাকরি করা, পরিবারকে সহযোগিতা করা এবং একটি নিরাপদ ও সুন্দর জীবন গড়ে তোলা।

তাদের স্বপ্ন ছোট নয়

পথে বেড়ে ওঠা শিশুদের স্বপ্নের কথা শুনলে বোঝা যায়, তাদের চাওয়াগুলো হয়তো সাধারণ, কিন্তু সেগুলোর গুরুত্ব অনেক গভীর। কেউ শিক্ষক হতে চায়, কেউ পুলিশ, আবার কেউ ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কারও কাছে সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো এমন একটি নিজের ঘর, যেখানে রাতে নিরাপদে ঘুমানো যাবে।

একটি শিশুর কাছে ‘ভালো ভবিষ্যৎ’ মানেই বিলাসবহুল জীবন নয়। নিয়মিত খাবার, স্কুলে যাওয়ার সুযোগ এবং পরিবারের সঙ্গে নিরাপদে বসবাসের নিশ্চয়তাই হয়তো তার কাছে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ।

অনিশ্চয়তায় ঘেরা জীবন

রাস্তায় দীর্ঘ সময় কাটানো শিশুদের জীবন নানা ঝুঁকিতে ভরা। ব্যস্ত সড়ক, অনিরাপদ পরিবেশ, অসুস্থতা এবং প্রতিকূল আবহাওয়া—সবকিছুর সঙ্গেই তাদের প্রতিদিন মানিয়ে নিতে হয়।

বৃষ্টি হলে তারা কোথায় আশ্রয় নেবে, অসুস্থ হলে চিকিৎসা কীভাবে হবে কিংবা রাতে কোথায় নিরাপদে ঘুমাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর তাদের জীবনে অনেক সময় অনিশ্চিত থাকে।

যেখানে নিরাপত্তা প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার হওয়া উচিত, সেখানে অনেক পথশিশু প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যেই বেড়ে উঠছে।

শুধু সাময়িক সাহায্য নয়, দরকার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ

ব্যক্তি ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন প্রায়ই পথশিশুদের খাবার, পোশাক ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে এসব সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাদের জীবন স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করতে আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।

শিক্ষার সুযোগ, নিরাপদ আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টিকর খাবার, পরিবারের আয়ের সুযোগ এবং শিশু সুরক্ষা—এসব বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।

একটি শিশুকে একদিন খাবার দেওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তাকে এমন একটি সুযোগ দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ, যার মাধ্যমে সে ভবিষ্যতে নিজের জীবন গড়ে তুলতে পারে এবং জীবিকার জন্য রাস্তায় নির্ভর করতে না হয়।

সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার

পথশিশুদের আমরা প্রায়ই শুধু অসহায় বা দুর্ভাগা হিসেবে দেখি। কিন্তু তাদেরও রয়েছে প্রতিভা, সৃজনশীলতা, আকাঙ্ক্ষা এবং স্বপ্ন। তাদের জীবনকে শুধু কষ্টের গল্প হিসেবে নয়, সম্ভাবনার গল্প হিসেবেও দেখা উচিত।

এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তাদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি তাদের স্বপ্ন, প্রতিভা, সংগ্রাম ও অর্জনের গল্পও সামনে আনা দরকার। এতে সমাজের মানুষের মধ্যে তাদের প্রতি আরও ইতিবাচক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হতে পারে।

পথ তাদের ঠিকানা, ভবিষ্যৎ নয়

প্রতিদিন শহরের ব্যস্ত রাস্তায় হাজারো মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যায় এসব শিশুর গল্প। কেউ তাদের পাশ দিয়ে চলে যায়, কেউ কয়েক মুহূর্তের জন্য তাকায়, আবার কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু তাদের প্রতিদিনের সংগ্রামের পেছনে থাকা গল্প জানার চেষ্টা করেন খুব কম মানুষই।

আজ যে শিশুটি রাস্তায় ফুল বিক্রি করছে, তাকে সারাজীবন রাস্তাতেই থাকতে হবে—এমন নয়। সঠিক সুযোগ, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও সহায়তা পেলে সেই শিশুই একদিন নিজের জীবন বদলে দিতে পারে।

পথশিশুদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শুধু সহানুভূতি নয়; প্রয়োজন শিক্ষা, নিরাপত্তা, অধিকার, মর্যাদা ও সুযোগ।

পথ হয়তো আজ তাদের ঠিকানা, কিন্তু পথ যেন কখনোই তাদের ভবিষ্যৎ না হয়।

শাকিলা বর্ষা ইংরেজি বিভাগ,উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়।