বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান পদে আসছে নতুন মুখ, তৃণমূল গোছানোয় জোর
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন ও সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে দল পুনর্গঠন এবং তৃণমূল গোছানোর কার্যক্রমে জোর দিয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে এ প্রক্রিয়ার সূচনা করেছে দলটি।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি সপ্তাহেই কেন্দ্রীয় দপ্তরে নতুন মুখ যুক্ত হতে পারে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পর্যায়ে পদায়ন ও দায়িত্বে রদবদল করা হবে। সাংগঠনিক কাঠামোয় নেতৃত্ব পরিবর্তন ও দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের পরই দলের সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন কারণে বহিষ্কৃত নেতাদের আবেদন যাচাই করে তাদের দলে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
সূত্র জানায়, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি বা মার্চে সপ্তম জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনা সামনে রেখে দলকে আরও সক্রিয় করতে তৎপর হয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড। এর অংশ হিসেবে গত দুই মাস ধরে বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও মহানগরে কমিটি পুনর্গঠনের কাজ চলছে।
ইতোমধ্যে কোথাও নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা, কোথাও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন, বহিষ্কৃত নেতাদের দলে ফিরিয়ে আনা এবং দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের মতো একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা জানিয়েছেন, আগামী চার থেকে পাঁচ মাস ধরে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের এ কার্যক্রম চলবে।
দল পুনর্গঠনে সরকার ও দলের দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সময়কার নীতির অনুসরণ নিয়ে আলোচনা চলছে। সে সময় সরকার ও দলের দায়িত্ব আলাদা রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো এবং মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা সাধারণত দলের শীর্ষ সাংগঠনিক পদে থাকতেন না।
এবারও ‘এক নেতা, এক পদ’ নীতি কার্যকরের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। অর্থাৎ মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সাংগঠনিক দায়িত্ব সীমিত করে দলীয় কাজে নেতৃত্বের বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তরুণ, মেধাবী ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের সামনে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নেতাদের ভূমিকার বিষয়টিও নেতৃত্ব বাছাইয়ের অন্যতম মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দলীয় সূত্রের ভাষ্য, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও ‘এক নেতা, এক পদ’ নীতির পক্ষে। তার মতে, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা একটি দায়িত্বে মনোযোগী হলে সরকার পরিচালনা ও সাংগঠনিক কার্যক্রম—উভয় ক্ষেত্রেই দক্ষতা ও কার্যকারিতা বাড়বে।
দল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটিতে ইতোমধ্যে রুহুল কবির রিজভী, আমান উল্লাহ আমান, অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার ও মো. ইসমাইল জবিউল্লাহকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটিতে বর্তমানে তিনটি পদ শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া মৃত্যু, পদত্যাগ ও বহিষ্কারের কারণে ভাইস চেয়ারম্যানের ১২টি পদও খালি রয়েছে। এসব পদ প্রবীণ ও মধ্যম সারির নেতাদের দিয়ে পূরণের উদ্যোগ চলছে।
কেন্দ্রীয় দপ্তরের দায়িত্বেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল ও সৈয়দ এমরান সালেহ—এই তিনজনের মধ্যে কাউকে দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
একই সঙ্গে ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল ও শ্রমিক দলসহ বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতৃত্ব পুনর্গঠনের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। আগস্টের শেষ দিকে অথবা আগামী মাসের শুরুতে ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলে নতুন নেতৃত্ব আসতে পারে বলে জানা গেছে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, দল পুনর্গঠনের কাজ চলমান রয়েছে এবং জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া শেষ হবে। যেসব জেলা, উপজেলা ও থানায় দ্রুত কমিটি দেওয়া প্রয়োজন, সেসব ইউনিট পুনর্গঠন করা হচ্ছে। বর্তমানে সীমিত পরিসরে সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে, যা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। তবে কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে সারাদেশের কাঠামোয় নতুন নেতৃত্ব আনা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনও জানিয়েছেন, জাতীয় কাউন্সিল সামনে রেখে দল পুনর্গঠনের কাজ চলছে। বিভিন্ন ইউনিটে নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। সারাদেশের ইউনিট কমিটিগুলো পুনর্গঠনের পরই বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে।
