মূল লেখায় যান
শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
অন্যান্য

রংপুরে ৪ খুন: পুলিশের বক্তব্যে অসংগতি, রাত ২টা ৪০ মিনিটে ফোন

প্রতিবেদক:
রংপুরে ৪ খুন: পুলিশের বক্তব্যে অসংগতি, রাত ২টা ৪০ মিনিটে ফোন

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক বক্তব্যের সঙ্গে সংগৃহীত তথ্যের একাধিক অসংগতি ও অমিল পেয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের সময়রেখা, ফরেনসিক আলামত এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিক ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) প্রকাশিত আসকের প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। এর আগে গত ২৪ ও ২৫ আগস্ট সংস্থাটির দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রংপুরে সরেজমিন তথ্যানুসন্ধান চালায়। এ সময় তারা নিহতদের স্বজন ও প্রতিবেশী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য, স্থানীয় থানা-পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), মর্গের কর্মী এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করেন।

রাত ২টা ৪০ মিনিটের ফোনকল ঘিরে প্রশ্ন

আসকের প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ডের সময়রেখা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন পূজা চক্রবর্তীর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০ আগস্ট রাত সাড়ে ১১টার দিকে তার বোনের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা হয়। এরপর রাত ২টা ৪০ মিনিটের দিকে প্রীতিলতার মুঠোফোন থেকে পূজার নম্বরে একটি কল আসে। তবে তিনি তখন কলটি ধরতে পারেননি।

অন্যদিকে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শেষ রাতের দিকে অভিযুক্তরা বাসার ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবনের সময় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়ায়। এরপর ভোরের দিকে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।

এ অবস্থায় রাত ২টা ৪০ মিনিটে প্রীতিলতার ফোন থেকে কলটি কে করেছিলেন, তখন ফোনটির অবস্থান কোথায় ছিল এবং এর পর পরিবারের সদস্যদের ব্যবহৃত ফোনগুলো কখন বন্ধ হয়ে যায়—এসব বিষয় দ্রুত কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) ও ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করার সুপারিশ করেছে আসক।

সংস্থাটির মতে, ফোনকলটির সময় পুলিশের বর্ণিত হত্যাকাণ্ডের সময়ের সঙ্গে কোনো অসংগতি তৈরি করে কি না, তা নির্ধারণ করা তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘ সময় বাসায় থাকার দাবির ফরেনসিক যাচাই চায় আসক

পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী, মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় অভিযুক্তরা পরিচয় গোপন রাখতে পরিবারের চার সদস্যকে একে একে শ্বাসরোধে হত্যা করে। হত্যার পর তারা দীর্ঘ সময় ওই বাসায় অবস্থান করে খাবারও খায় বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আসক। সংস্থাটির প্রশ্ন, অভিযুক্তরা যদি দীর্ঘ সময় বাসায় অবস্থান করে থাকে এবং সেখানে খাবার খেয়ে থাকে, তাহলে ঘরের আসবাবপত্র, রান্নাঘর, ব্যবহৃত পাত্র, বাথরুম ও বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থান থেকে ডিএনএ, আঙুলের ছাপ, ত্বকের কোষ ও চুলসহ প্রয়োজনীয় জৈবিক আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে কি না এবং সেগুলো অভিযুক্তদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে কি না।

এসব আলামত সংগ্রহ ও পরীক্ষার ফলাফল তদন্তের স্বচ্ছতার স্বার্থে আদালতের সামনে স্পষ্টভাবে উপস্থাপনের কথাও বলেছে মানবাধিকার সংস্থাটি।

বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা নিয়েও প্রশ্ন

হত্যাকাণ্ডের রাতে পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছে আসক। পুলিশের পক্ষ থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা এড়াতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হলেও, ঠিক কখন, কীভাবে এবং কারা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছিল, তা প্রযুক্তিগত প্রমাণের মাধ্যমে নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে সংস্থাটি।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিবারের বক্তব্য

তথ্যানুসন্ধানের সময় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলেন আসকের প্রতিনিধিরা। সিদ্ধার্থের বাবা তার ছেলেকে আটকের সময় পোশাক পরিবর্তন এবং ঘটনার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অপর অভিযুক্ত সীমান্তের পরিবারের সদস্যরাও প্রতিনিধিদলের কাছে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে না পারলেও মর্গের কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেন আসকের প্রতিনিধিরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মরদেহগুলোতে পচনের লক্ষণ ও আঘাতের চিহ্ন ছিল। তবে যৌন নির্যাতনের দৃশ্যমান কোনো আলামত তারা দেখতে পাননি বলে জানান।

তবে আসক বলেছে, মর্গের কর্মীদের চাক্ষুষ পর্যবেক্ষণকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, আঘাতের ধরন এবং কোনো ধরনের নির্যাতন হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য ময়নাতদন্ত ও সিআইডির ল্যাবরেটরি পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন প্রয়োজন।

অনুমান নয়, প্রমাণভিত্তিক তদন্তের আহ্বান

রংপুর ডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং বিভ্রান্তি এড়াতে সব ধরনের আলামত যাচাই করা হচ্ছে।

তবে আসকের মতে, ঘটনাটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া সংশয় দূর করতে এবং প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে অনুমাননির্ভর কোনো ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি সূত্র, সময়রেখা ও আলামত নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।