১৯ কিলোমিটারের লক্ষ্যে খনন ২১ কিলোমিটার, সরকারি কোষাগারে ফেরত ৪০ লাখ
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দের পুরো অর্থ ব্যয় না হলে সাধারণত কাজের পরিমাণও কমে যাওয়ার কথা। তবে চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে ঘটেছে এর উল্টো ঘটনা। নির্ধারিত বরাদ্দের চেয়ে কম অর্থ ব্যয় করে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি খাল খনন করা হয়েছে। দুটি প্রকল্পে প্রায় ২১ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন শেষে অব্যয়িত ৪০ লাখ ৮০ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেয়া হয়েছে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে উপজেলার ‘খদ্দের খাল’ এবং ‘নওড়া–মেহের গোদা খাল’ পুনঃখননের জন্য সরকার মোট ৪ কোটি ৩৭ লাখ ৮১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়। প্রকল্প দুটির আওতায় প্রাথমিকভাবে ১৯ কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কাজ শেষে দেখা যায়, নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার বেশি খনন করা হয়েছে। অথচ ব্যয় হয়েছে বরাদ্দের চেয়ে কম।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় ও সরকারি হিসাব বিবরণী সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, ‘খদ্দের খাল’ পুনঃখননে বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি ৯ লাখ ২ হাজার ৪৭০ টাকা। ডাকাতিয়া নদীর খোর্দ থেকে মোড়াগাঁও বটতলা শৈলখালী খাল পর্যন্ত এ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৮৮ লাখ ৫৪ হাজার ৪১৩ টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ২০ লাখ ৪৮ হাজার টাকা সাশ্রয় হয়েছে।
অন্যদিকে, ‘নওড়া–মেহের গোদা খাল’ পুনঃখননের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৭ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৮ লাখ ৪৬ হাজার ১৯৪ টাকা। এ প্রকল্পেও প্রায় ২০ লাখ ৩২ হাজার টাকা সাশ্রয় হয়েছে।
দুটি প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছে ৩ কোটি ৯৭ লাখ ৬০০ টাকা। ফলে ৪০ লাখ ৮০ হাজার টাকা অব্যয়িত থাকে। কাজ শেষে ওই অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেয়া হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সোহেল রানা পাপ্পু বলেন, শুরুতে দুটি প্রকল্পের আওতায় ১৯ কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্যমাত্রা ও বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সুষ্ঠু পরিকল্পনা, নিবিড় তদারকি ও আধুনিক যন্ত্রপাতির যথাযথ ব্যবহারের কারণে কম খরচে বেশি কাজ করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণের নির্ধারিত শর্তও বজায় রাখা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি ব্যবহার করায় একদিকে কাজের সময় কমেছে, অন্যদিকে শ্রম ও অন্যান্য খাতেও ব্যয় সাশ্রয় হয়েছে। ফলে নির্ধারিত অর্থের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি খাল খনন করা সম্ভব হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, খাল খননের মতো প্রকল্পে শুধু মাটি কাটার পরিমাণ নির্ধারণ করলেই হয় না। কোথায় কতটুকু খনন প্রয়োজন, কোন অংশে যন্ত্র ব্যবহার হবে এবং কোথায় শ্রমিক দিয়ে কাজ করা হবে—এসব বিষয়ে সঠিক পরিকল্পনা ও মাঠপর্যায়ে তদারকি গুরুত্বপূর্ণ। শাহরাস্তির দুটি প্রকল্পে এসব বিষয় সমন্বয় করেই কাজ করা হয়েছে।
সরকারি প্রকল্পে বরাদ্দের পুরো অর্থ ব্যয় করাকে অনেক সময় কাজ শেষ হওয়ার একটি প্রচলিত সূচক হিসেবে দেখা হয়। তবে শাহরাস্তির এই দুই প্রকল্পের হিসাব বলছে, বরাদ্দের পুরো অর্থ ব্যয় না করেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি কাজ করা সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে শুধু অর্থ সাশ্রয়ই নয়, সাশ্রয় করা অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেয়াও গুরুত্বপূর্ণ। দুটি প্রকল্পে অব্যয়িত ৪০ লাখ ৮০ হাজার টাকা ফেরত দেয়াকে সরকারি অর্থ ব্যবহারে জবাবদিহিতার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাদের মতে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে জনগণের অর্থ ব্যয় হয়। সেই অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে একই বরাদ্দে বেশি উন্নয়নকাজ করা সম্ভব। পাশাপাশি কাজ শেষে অব্যয়িত অর্থ ফেরত দেয়া হলে সরকারি অর্থের অপচয় কমবে এবং প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থাও বাড়বে।
শাহরাস্তির দুটি খাল দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে পানিপ্রবাহে বাধাগ্রস্ত ছিল। পুনঃখননের ফলে খালের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় কৃষি ও পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
খাল সচল হলে বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে কৃষিজমিতে সেচের সুবিধা, মাছের আবাসস্থল তৈরি এবং স্থানীয় জলাবদ্ধতা নিরসনেও এর ভূমিকা থাকতে পারে। ফলে প্রকল্পে আর্থিক সাশ্রয়ের পাশাপাশি এর বাস্তব সুফলও স্থানীয় জনগণ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থ সাশ্রয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতার বিষয়টি প্রশাসনের উচ্চপর্যায়েও গুরুত্ব পেয়েছে। এর স্বীকৃতি হিসেবে গত ৮ আগস্ট শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনিরা খাতুনকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিশেষ সম্মানসূচক আমন্ত্রণ জানানো হয়।
সেখানে প্রকল্প বাস্তবায়ন, বাজেট ব্যবস্থাপনা, সরকারি অর্থ সাশ্রয় ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা হয় বলে উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, একটি প্রকল্পের সাফল্য শুধু নির্ধারিত কাজ শেষ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নির্ধারিত মান বজায় রেখে কম খরচে বেশি কাজ করা এবং অব্যয়িত অর্থ যথাযথভাবে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেয়াও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শাহরাস্তির দুটি খাল পুনঃখনন প্রকল্পে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। ১৯ কিলোমিটার খননের লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে হয়েছে প্রায় ২১ কিলোমিটার। বরাদ্দ ছিল ৪ কোটি ৩৭ লাখ ৮১ হাজার টাকা, ব্যয় হয়েছে ৩ কোটি ৯৭ লাখ ৬০০ টাকা। আর অব্যয়িত ৪০ লাখ ৮০ হাজার টাকা ফেরত গেছে সরকারি কোষাগারে।
সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে যেখানে অনিয়ম, অপচয় ও প্রকল্প ব্যয় বাড়ার অভিযোগ প্রায়ই আলোচনায় আসে, সেখানে শাহরাস্তির এই হিসাব ব্যতিক্রমী। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এ ধরনের উদ্যোগ শুধু একটি উপজেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অন্যান্য সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পেও অনুসরণ করা হবে। এতে একই অর্থে আরও বেশি উন্নয়নকাজ করা সম্ভব হবে।
তাদের মতে, সরকারি অর্থকে ‘বরাদ্দ শেষ করার অর্থ’ হিসেবে নয়, জনগণের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিটি প্রকল্পে কম খরচে বেশি ও মানসম্মত কাজের সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।
