মৃত্যুর আগে তাজমিনের সঙ্গে কী ঘটেছিল, সামনে এল সিসিটিভি ফুটেজ
কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। মৃত্যুর আগের রাতে পদুয়ার বাজারের একটি হোটেলের সামনে বাস থেকে নামার পর তাজমিনের চলাচলের সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে। ফুটেজে তাকে কয়েকটি স্টেশনারি দোকানের সামনে অবস্থান করতে দেখা যায়। এদিকে মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে কিছুটা দূরে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা জব্দ করেছে পুলিশ। এসব তথ্যের সূত্র ধরে তদন্ত চালাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গত বুধবার রাত পৌনে ১২টার দিকে পদুয়ার বাজারের নূরজাহান হোটেলের সামনে আইকনিক পরিবহনের একটি বাস থেকে নামে তাজমিন। এরপর হোটেলের পশ্চিম পাশে কয়েকটি স্টেশনারি দোকানের দিকে যায় সে। একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দোকানির সঙ্গে কথা বলতেও দেখা যায় তাকে। এ সময় দোকানিকে তাজমিনকে কিছু একটা দেখাতে বা কোনো দিকনির্দেশনা দিতে দেখা যায়।
ফুটেজ অনুযায়ী, রাত ১২টার দিকে দোকানের সামনে কিছু একটা দেখানোর পর তাজমিন সেখান থেকে অন্য পাশে সরে যায়। পরে রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে নূরজাহান হোটেল এলাকা ছেড়ে যেতে দেখা যায়। তবে ওই এলাকা থেকে বের হওয়ার পর সে কোন পথে গিয়েছিল, তা নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো সিসিটিভি ফুটেজ এখনও পাওয়া যায়নি।
তদন্তকারীরা এখন তাজমিনের চলাচলের পথ, সম্ভাব্য যাতায়াতের মাধ্যম এবং ওই রাতে তার সঙ্গে কারও দেখা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন।
এদিকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে কিছুটা দূরে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা জব্দ করা হয়েছে। এ কারণে নূরজাহান হোটেলের সামনে থেকে তাজমিন কোনো অটোরিকশায় উঠেছিল কি না, তা জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। তবে জব্দ করা অটোরিকশাটির সঙ্গে তাজমিনের মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কসংলগ্ন লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত জান্নাতুল তাজমিন যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামের আবদুল আলীমের মেয়ে। বাবার চাকরির সুবাদে কুমিল্লায় বেড়ে ওঠা তাজমিন স্থানীয় ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, চার দিন আগে এক বান্ধবীর বাড়িতে বেড়াতে যায় তাজমিন। পরে ওই বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে যায় সে। সেখান থেকে বুধবার রাতে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হয়। রাতে মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে কল করেন তার বাবা আবদুল আলীম। তবে কল রিসিভ না হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
পুলিশের অনুসন্ধানে তাজমিনের ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলেও জানা গেছে। তবে এসব স্থানে তার সঙ্গে কেউ ছিল কি না, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে তাজমিনকে পড়িয়েছেন। মেয়েটি চঞ্চল স্বভাবের ছিল। তার মা কিছুটা অসুস্থ থাকায় দুই যমজ ভাইয়ের দেখাশোনাও করত সে। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন এবং কাজের কারণে সকালে বাসা থেকে বের হয়ে রাতে ফিরতেন। তবে মেয়েকে খুব আদর করতেন তিনি।
শিক্ষক আরও জানান, বাসায় রাগ হলে তাজমিন মাঝেমধ্যে হুট করে বের হয়ে যেত। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, তাজমিনের মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে পুলিশের একাধিক সংস্থা তদন্ত শুরু করেছে।
কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ জানান, বৃহস্পতিবার সকালে স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাও জব্দ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নিহতের শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। তবে তার গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। প্রাথমিকভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা অটোরিকশাটির নিবন্ধন রয়েছে। সেটির সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তাজমিনের মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে।
