১০ পর্যটকের মৃত্যুর দায় নেবে কে?
মানুষ অবকাশযাপনে যায় স্বস্তি ও আনন্দের খোঁজে। পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে, সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। কিন্তু কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে বেড়াতে গিয়ে ১০ পর্যটকের জীবনাবসান হয়েছে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে। স্বজনদের কাছে আনন্দের স্মৃতি এখন পরিণত হয়েছে গভীর শোকে।
এই প্রাণহানির পর রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা, পরিচালনার অনুমোদন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানটির ফায়ার সেফটি লাইসেন্স ছিল না, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রও নেওয়া হয়নি। এর আগে অগ্নিঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল বলেও জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।
প্রশ্ন হলো, ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করার পরও কীভাবে রিসোর্টটির কার্যক্রম চলছিল? নিরাপত্তার ঘাটতি দূর করতে কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল? আর প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই কার্যক্রম চলতে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায় কতটুকু?
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে সাতটার দিকে রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। কাঠের তৈরি স্থাপনাটিতে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে সকাল আটটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তারের তত্ত্বাবধানে প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ততক্ষণে প্রাণ হারিয়েছেন ১০ জন।
ঘটনায় অন্তত ছয়জন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন থাকতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে প্রশাসন। তবে পরিচয় ও পারিবারিক সম্পর্ক নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন ইউএনও পান্না আক্তার।
সতর্কবার্তার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল : কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানিয়েছেন, গত জুন মাসে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পরিদর্শনের পর প্রতিষ্ঠানটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে ১১ জুন নোটিশ দেওয়া হয়।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুয়াইদ ১৭ অক্টোবর ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, রিসোর্টটির ফায়ার সেফটি লাইসেন্স ছিল না।
ইউএনও পান্না আক্তারের ভাষ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটির বড় অংশ কাঠের তৈরি হওয়ায় সমুদ্রের বাতাসে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। স্থাপনাটিতে বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেতব্যবস্থা, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনার মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার ঘাটতি ছিল। রিসোর্টটি মাত্র সাত-আট মাস আগে নির্মিত হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সতর্কবার্তার পর রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার ঘাটতি দূর করেছিল কি না। সংশ্লিষ্ট দপ্তর পুনরায় পরিদর্শন করেছিল কি না এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হলে কার্যক্রম বন্ধ বা অন্য কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কোনো স্থাপনায় ঝুঁকি শনাক্ত করার পর শুধু নোটিশ দিয়েই দায়িত্ব শেষ হয় না। তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, তা নথিপত্রের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে। সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল—এ তথ্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই সতর্কতার পর কী করা হয়েছিল, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়েও প্রশ্ন : রিসোর্টটির পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকার বিষয়টিও সামনে এসেছে। পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্তোরাঁ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ নামে কোনো প্রতিষ্ঠান ছাড়পত্রের জন্য আবেদনও করেনি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ১২ ধারায় প্রযোজ্য প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে রিসোর্টটির ক্ষেত্রে ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক ছিল কি না, তা সংশ্লিষ্ট বিধিমালা, প্রতিষ্ঠানের শ্রেণি ও নথিপত্র যাচাই করে নির্ধারণ করতে হবে।
বাংলাদেশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ আইন, ২০১৪-তেও নিবন্ধন ও লাইসেন্সসংক্রান্ত বিধান রয়েছে। একইভাবে, অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন, ২০০৩ অনুযায়ী রিসোর্টটির নির্মাণ, নকশা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী ধরনের অগ্নিনিরাপত্তা অনুমোদন প্রয়োজন ছিল, তা যাচাই করা জরুরি।
অর্থাৎ, কেবল ছাড়পত্র বা লাইসেন্স ছিল না—এ তথ্য জানাই যথেষ্ট নয়। কোন অনুমোদন আইনত বাধ্যতামূলক ছিল, সেগুলো ছাড়া কীভাবে কার্যক্রম চলেছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনগত দায়িত্ব কী ছিল, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
মালিক থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তর—তদন্তের আওতা কত দূর? : কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, রিসোর্টটির রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তদন্তে আগুনের সূত্রপাত, দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণ, অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থার অবস্থা এবং প্রাণহানির পেছনে কোনো অবহেলা বা নিরাপত্তাগত ঘাটতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্থাপনাটির নির্মাণ ও ব্যবহারসংক্রান্ত অনুমোদন, ব্যবসায়িক নিবন্ধন, পরিবেশগত ছাড়পত্র, ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং আগের নোটিশের পর গৃহীত পদক্ষেপের নথিও পর্যালোচনা করা জরুরি।
জালিয়া পালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এসএম সৈয়দ আলম জানিয়েছেন, জায়গাটির মালিকানা নিয়ে বিরোধ ছিল। এ ক্ষেত্রে জমির মালিকানা, রিসোর্ট পরিচালনার অধিকার এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার ওপর ছিল, তা নির্ধারণ করতে হবে।
রিসোর্টটির ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে তদন্ত শুধু ম্যানেজারের দায়িত্বে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা, নিরাপত্তাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং পূর্ববর্তী সতর্কবার্তা সম্পর্কে তাঁদের জানা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩০৪ক ধারায় অবহেলাজনিত কাজের কারণে মৃত্যু ঘটলে শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে শুধু মালিক হওয়া বা অনুমোদন না থাকার তথ্য দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কারও ফৌজদারি দায় প্রতিষ্ঠিত হয় না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবহেলা বা বেপরোয়া কাজের সঙ্গে প্রাণহানির কার্যকারণগত সম্পর্ক তদন্তে প্রমাণিত হতে হবে।
একইভাবে, দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা তাঁদের দায়িত্ব অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন কি না, সেটিও যাচাই করা জরুরি। নির্দিষ্ট কোনো দায়িত্ব পালনে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে কি না, তা বিবেচনা করতে হবে।
তদন্তের পর কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি: দশ পর্যটকের মৃত্যু কেবল একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নয়; এটি পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপত্তাব্যবস্থা, আইন প্রয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিশেষ করে, আগেই ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করার পরও যদি প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না হয়ে থাকে, তাহলে সেই ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি।
স্বজনহারা পরিবারগুলোর কাছে কোনো ক্ষতিপূরণই প্রিয়জনের শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না। তবু প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, দায় নির্ধারণ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
পর্যটন এলাকায় হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁর অগ্নিনিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং জরুরি বহির্গমনব্যবস্থা নিয়মিত যাচাই করা প্রয়োজন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ, চিহ্নিত অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের প্রাণহানি ঠেকাতে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
টুপটুপ রিসোর্টে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় দায় কার, তা তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—মানুষের জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং আইন প্রয়োগে কোনো ঘাটতি থাকলে তার জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। স্বজনহারা পরিবারগুলোর ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা পূরণে কাউকে যেন দায়িত্বের বাইরে রাখা না হয়।
