মাসহ ৩ মেয়েই নিহত: আসলে কী ঘটেছিল, বাকরুদ্ধ একমাত্র ছেলে
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে এক হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ডে মা ও তার তিন মেয়ের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো এলাকায়। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে উপজেলার একটি বাসায় শাহিনুর বেগম (৩৮), তার তিন মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), ইকরা আক্তার (১৭) ও শিফা আক্তারকে (৯) ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় পরিবারের একমাত্র ছেলে সিফাত হোসেন (১৮) প্রাণে বেঁচে গেলেও হারিয়েছেন তার পুরো পরিবার।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান পরিবারের কর্তা কামাল হোসেন। এরপর স্বামীহারা শাহিনুর বেগম তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে কষ্ট করে সংসার চালিয়ে আসছিলেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার সকালে নেমে আসে সেই পরিবারের সবচেয়ে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি।
ঘটনার সময় সিফাত হোসেন তার কর্মস্থলে ছিলেন। তিনি রায়পুর সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র এবং পড়াশোনার পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ী ও রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদের প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন।
সাইফুল ইসলাম মুরাদ জানান, সকালে সিফাত যথারীতি কাজে আসে। পরে বেলা ১১টার দিকে তার মা ও তিন বোনকে কুপিয়ে হত্যার খবর আসে। খবর শুনে ঘটনাস্থলে গিয়ে ভেঙে পড়েন সিফাত। স্বজন হারানোর শোকে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং দীর্ঘ সময় কারও সঙ্গে কথা বলতে পারেননি।
স্থানীয়দের ধারণকৃত ভিডিওতে দেখা যায়, মা ও তিন বোনের মরদেহ দেখে বুক চাপড়ে আহাজারি করছেন সিফাত। পরে তাকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়।
নিহতদের মধ্যে বড় মেয়ে সায়মা আক্তার ছিলেন মেধাবী শিক্ষার্থী। তিনি আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে উচ্চশিক্ষার জন্য চেষ্টা করছিলেন। তার সহপাঠী প্রমি আক্তার জানান, সায়মা মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।
মেজো মেয়ে ইকরা আক্তার লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। আর ছোট মেয়ে শিফা স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল।
রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বাহারুল আলম জানান, পাঁচজনকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তাদের মধ্যে মা ও দুই মেয়ে হাসপাতালে মারা যান। গুরুতর আহত অপর মেয়েকে ঢাকায় নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়। নিহতদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে প্রেমঘটিত বিরোধ অথবা অর্থনৈতিক লেনদেনসংক্রান্ত কোনো দ্বন্দ্বের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রায়পুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. আব্দুর রাশেদ বলেন, “হত্যাকাণ্ডের কারণ এবং এর সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি।”
এদিকে একই দিনে মা ও তিন বোনকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন সিফাত হোসেন। পুরো পরিবার হারানোর এই মর্মান্তিক ঘটনায় রায়পুরজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্থানীয়রা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
