বুর্জ খলিফার চেয়েও বেশি খরচে তৈরি এই গেম
ভিডিও গেমপ্রেমীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে। প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি গেমারের আলোচনার কেন্দ্রে থাকা গ্র্যান্ড থেফট অটো (জিটিএ) সিক্স অবশেষে মুক্তির পথে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রকস্টার গেমস নিশ্চিত করেছে, আগামী ১৯ নভেম্বর ২০২৬ বিশ্বব্যাপী প্লেস্টেশন ৫ এবং এক্সবক্স সিরিজ এক্স/এস প্ল্যাটফর্মে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি পাবে বহুল প্রতীক্ষিত এই গেম। মুক্তির আগেই শুরু হয়েছে প্রি-অর্ডার, আর সেই সঙ্গে গেমটিকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
তবে জিটিএ সিক্সকে ঘিরে সবচেয়ে বড় চমক শুধু এর মুক্তি নয়, বরং এর নির্মাণ ব্যয় ও উন্নয়ন সময়। গেমিং বিশ্লেষকদের দাবি, এটি হতে যাচ্ছে বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভিডিও গেম। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গেমটি তৈরি করতে ব্যয় হয়েছে ১৫০ থেকে ২০০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৮ থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা। যদিও রকস্টার গেমস এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বাজেট প্রকাশ করেনি, তবুও শিল্প বিশ্লেষকদের এই হিসাবই বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
যদি এই হিসাব সঠিক হয়, তাহলে জিটিএ সিক্স শুধু ভিডিও গেম নয়, পুরো বিনোদন শিল্পের ইতিহাসেই সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলোর একটি হিসেবে জায়গা করে নেবে। তুলনামূলকভাবে বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন বুর্জ খলিফা নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১৫০ কোটি মার্কিন ডলার। অর্থাৎ বিভিন্ন প্রতিবেদনের অনুমান অনুযায়ী, জিটিএ সিক্স তৈরিতে ব্যয় হয়েছে বুর্জ খলিফার সমপরিমাণ কিংবা তার চেয়েও বেশি অর্থ।
এখানেই শেষ নয়। হলিউডের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিনেমাগুলোর মধ্যে থাকা অ্যাভাটার, অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম এবং স্টার ওয়ারস: দ্য ফোর্স অ্যাওয়েকেনস এই তিনটি চলচ্চিত্রের নির্মাণ ব্যয় মিলিয়েও যে অঙ্ক দাঁড়ায়, জিটিএ সিক্সের সম্ভাব্য বাজেট তার কাছাকাছি বা আরও বেশি বলে দাবি করা হচ্ছে। ফলে একটি ভিডিও গেম যে এত বিশাল বিনিয়োগের প্রকল্প হতে পারে, সেটিই এখন বিস্ময়ের বিষয় হয়ে উঠেছে।
১২ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা
জিটিএ সিরিজের সর্বশেষ মূল গেম জিটিএ ফাইভ বাজারে আসে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে। মুক্তির পর থেকেই এটি বিশ্বজুড়ে রেকর্ড গড়ে এবং এখন পর্যন্ত ২০ কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে বলে প্রকাশক টেক-টু ইন্টারঅ্যাকটিভ জানিয়েছে। এরপর থেকেই ভক্তরা নতুন সংস্করণের অপেক্ষায় ছিলেন।
প্রথমে গুঞ্জন, পরে তথ্য ফাঁস, ট্রেলার প্রকাশ, মুক্তির তারিখ পরিবর্তন সব মিলিয়ে প্রায় ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলেছে জিটিএ সিক্সকে ঘিরে অপেক্ষা। এত দীর্ঘ উন্নয়ন সময় ভিডিও গেম শিল্পেও বিরল। এই সময়ে গেমটির প্রযুক্তি, কাহিনি, গ্রাফিক্স এবং গেমপ্লে বারবার উন্নত করা হয়েছে, যাতে এটি বর্তমান প্রজন্মের কনসোলের সর্বোচ্চ সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারে।
কী থাকছে নতুন এই গেমে?
রকস্টার গেমসের প্রকাশিত ট্রেলার ও তথ্য অনুযায়ী, জিটিএ সিক্সের গল্প আবর্তিত হবে লিওনিডা নামের কাল্পনিক অঙ্গরাজ্যকে ঘিরে, যার সবচেয়ে পরিচিত শহর ভাইস সিটি। এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্য ও মায়ামি শহর থেকে অনুপ্রাণিত।
এবারের গেমে প্রথমবারের মতো সিরিজের অন্যতম প্রধান চরিত্র হিসেবে দেখা যাবে লুসিয়াকে। তার সঙ্গে থাকবেন আরেক চরিত্র জেসন। অপরাধ, টিকে থাকা, পালিয়ে বেড়ানো এবং একসঙ্গে বড় ধরনের অভিযানে অংশ নেওয়ার গল্প নিয়েই এগোবে গেমটির মূল কাহিনি। অনেকেই এই জুটিকে আধুনিক সময়ের ‘বনি অ্যান্ড ক্লাইড’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন।
প্রযুক্তির নতুন উচ্চতায় রকস্টার
জিটিএ সিক্স তৈরিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজারো সফটওয়্যার প্রকৌশলী, গেম ডিজাইনার, থ্রিডি অ্যানিমেটর, ভয়েস শিল্পী, মোশন ক্যাপচার বিশেষজ্ঞ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিশেষজ্ঞ কাজ করেছেন। গেমটির প্রতিটি চরিত্র, শহর, যানবাহন, আবহাওয়া, সমুদ্র, বন্যপ্রাণী এমনকি পথচারীদের আচরণকেও বাস্তবসম্মত করে তুলতে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি।
জানা গেছে, গেমটিতে লাখ লাখ লাইনের কোড, হাজারো অ্যানিমেশন এবং অসংখ্য কাস্টম প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। উন্নত আলোর প্রতিফলন, বাস্তবসম্মত পদার্থবিজ্ঞান, ডাইনামিক আবহাওয়া, উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বিশাল ওপেন-ওয়ার্ল্ড ম্যাপ জিটিএ সিক্সকে আগের যেকোনো সংস্করণের তুলনায় অনেক বেশি বাস্তবসম্মত করে তুলবে।
কেন এত ব্যয়?
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু গেম তৈরিই নয় গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন, মোশন ক্যাপচার, ভয়েস রেকর্ডিং, সঙ্গীতের স্বত্ব, বিপণন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘ সময় ধরে হাজারো কর্মীর বেতন সবকিছু মিলিয়েই জিটিএ সিক্সের বাজেট কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
রকস্টারের লক্ষ্য শুধু একটি গেম প্রকাশ করা নয়; বরং এমন একটি ভার্চুয়াল বিশ্ব তৈরি করা, যেখানে খেলোয়াড়রা বছরের পর বছর নতুন অভিজ্ঞতা উপভোগ করতে পারবেন।
বিক্রিতেও নতুন রেকর্ডের আশা
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের আগ্রহের কারণে গেমটি মুক্তির আগেই প্রি-অর্ডারে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, মুক্তির প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই জিটিএ সিক্স কয়েকশ কোটি ডলারের বিক্রি করতে পারে। অনেকের মতে, এটি শুধু ভিডিও গেম নয়, বিনোদন শিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক উদ্বোধনেও পরিণত হতে পারে।
দীর্ঘ ১২ বছরের অপেক্ষা, রেকর্ড বাজেট, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং বিশ্বজুড়ে তুমুল আগ্রহ সব মিলিয়ে জিটিএ সিক্স এখন শুধু একটি ভিডিও গেম নয়, বরং প্রযুক্তি ও বিনোদন শিল্পের ইতিহাসে অন্যতম বড় ঘটনা। কোটি কোটি গেমারের চোখ এখন আগামী ১৯ নভেম্বরের দিকে, যেদিন শেষ হবে বহু প্রতীক্ষার অধ্যায় এবং শুরু হবে জিটিএর নতুন যুগ।
