ঢাকার চলমান শরীরের অ্যানাটমি: কুন্তল বাড়ৈ- এর প্রদর্শনী
ঢাকা—একটি শহর, যেখানে থেমে থাকাও এক ধরনের চলাচল। প্রতিদিনের যানজট, অসংখ্য মানুষের যাতায়াত, অপেক্ষা, রাস্তার ব্যস্ততা, ভবন ও অবকাঠামোর ক্রমাগত পরিবর্তন—সব মিলিয়ে শহরটি যেন একটি জীবন্ত শরীর, যার নিজস্ব স্পন্দন আছে, আছে চাপ, ক্লান্তি, দ্বন্দ্ব ও আকাঙ্ক্ষা। সমকালীন শিল্পী কুন্তল বাড়ৈ তাঁর নতুন একক প্রদর্শনী ‘Anatomy of Transit’-এ ঢাকার এই চলমান শরীরটিকেই অনুসন্ধান করেছেন।
প্রদর্শনীতে নগরের অবকাঠামো কেবল দৃশ্যমান বাস্তবতা হিসেবে উপস্থিত হয়নি; বরং তা হয়ে উঠেছে মানুষের জীবনযাপন, মানসিকতা ও সামাজিক সম্পর্কের প্রতীক। রাস্তা এখানে ধমনীর মতো, মোড়গুলো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের মতো, আর যানবাহন প্রতিনিয়ত সক্রিয় এক নগরদেহের প্রতীক হয়ে ওঠে। কুন্তলের ছবিতে তাই ঢাকা শুধু একটি শহর নয়—এটি একটি অভিজ্ঞতা, একটি মানসিক ভূগোল।
ঢাকার বাইরে থেকে তাকালে শহরটিকে মনে হয় অবিরাম চলাচলের এক বিশাল দৃশ্যপট। গাড়ি, বাস, মানুষ, ভবন, সেতু, রাস্তা ও ট্রাফিক সিগন্যাল যেন একই ছন্দে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু এই দৃশ্যমান গতির অন্তরালে রয়েছে অপেক্ষা, স্থবিরতা, অনিশ্চয়তা, চাপ এবং প্রতিদিন টিকে থাকার সংগ্রাম। এ প্রদর্শনীতে কুন্তল বাড়ৈ সেই দৃশ্যমান ও অদৃশ্য নগর-অভিজ্ঞতার মধ্যবর্তী অঞ্চলটিকেই তাঁর শিল্পের বিষয় করেছেন।
ঢাকার গুলশান-২-এর প্লাট-ফর্মস গ্যালারি-তে আগামী ১৫ আগস্ট শুরু হচ্ছে কুন্তল বাড়ৈর এই একক প্রদর্শনী। চলবে ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত। ১৫ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় প্রদর্শনীর উদ্বোধন হবে।
কুন্তল বাড়ৈর কাছে চলাচল কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে যাওয়ার প্রক্রিয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আকাঙ্ক্ষা, বাস্তুচ্যুতি, অনিশ্চয়তা, দৈনন্দিন অভ্যাস এবং নাগরিক জীবনের সঙ্গে মানুষের প্রতিনিয়ত সমঝোতা।
এই প্রদর্শনীতে মানুষের চলাচল এবং নগরের অবকাঠামোর পারস্পরিক সম্পর্ককে শিল্পী নতুনভাবে দেখতে চেয়েছেন। একটি রাস্তা তাই আর শুধু রাস্তা থাকে না; একটি ট্রাফিক সিগন্যাল হয়ে ওঠে থেমে থাকার মুহূর্ত; একটি যানবাহন হয়ে ওঠে সাময়িক ব্যক্তিগত পরিসর কিংবা বিচ্ছিন্নতার জায়গা। আর একটি মোড় হয়ে ওঠে অসংখ্য মানুষের আলাদা আলাদা জীবনকাহিনি এসে মিলিত হওয়ার স্থান।
এই ভাবনাতেই অ্যানাটমি অফ ট্রানসিট শুধু যানজট বা পরিবহনব্যবস্থার দৃশ্যায়ন নয়। এটি শহরের ভেতর মানুষের অবস্থান, তার পরিচয়, স্মৃতি, বিচ্ছিন্নতা এবং অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি নিয়ে একটি শিল্পিত প্রশ্ন।
কুন্তল বাড়ৈর শিল্পচর্চার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো শহরকে কেবল দৃশ্য হিসেবে না দেখে তার ভেতরের মনস্তত্ত্ব ও সামাজিক বাস্তবতার অনুসন্ধান করা। তাঁর শিল্পীজীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ঢাকা শহরের পরিবর্তন, এর দ্রুত বিস্তার, নাগরিক বিশৃঙ্খলা এবং বিশেষত যানজটের অভিজ্ঞতা। শিল্পীর দীর্ঘদিনের কাজেও ঢাকার গতিশীলতা ও অন্তর্গত বৈপরীত্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে।
এই ধারাবাহিকতায় ‘অ্যানাটমি অফ ট্রানসিট’ তাঁর দীর্ঘদিনের নগর-অনুসন্ধানের একটি নতুন অধ্যায়। তাঁর ছবিতে রাস্তা, গাড়ি, স্থাপত্য, মানুষের অবয়ব এবং বিমূর্ত আকৃতি একে অন্যের ওপর স্তর তৈরি করে। ফলে পরিচিত নগরদৃশ্যগুলো একই সঙ্গে চেনা ও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। দর্শক নিজের পরিচিত শহরকেই যেন একটি নতুন মানসিক মানচিত্রের ভেতর আবিষ্কার করতে শুরু করেন।
কুন্তলের কাজে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও শিল্পিত ব্যাখ্যার একটি সূক্ষ্ম সমন্বয় দেখা যায়। তাঁর শিল্প বাস্তবতাকে সরাসরি অনুকরণ করে না, আবার সম্পূর্ণ বিমূর্ততার মধ্যেও হারিয়ে যায় না। বরং বাস্তব অভিজ্ঞতা, নগরের অরাজকতা এবং হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতি তাঁর ছবিতে একটি জটিল দৃশ্যভাষা তৈরি করে।
কুন্তল বাড়ৈ: শহর, মানুষ ও ছবির দীর্ঘ যাত্রা
১৯৮৭ সালে বরিশালে জন্ম নেওয়া কুন্তল বাড়ৈ ইউডা থেকে ফাইন আর্টসে অনার্স ও মাস্টাস ডিগ্রি অর্জন করে। ২০১৮ সালে ঢাকার আলিয়েন্স ফ্রসেসের লা গ্যালারিতে প্রথম প্রদর্শনী করেন। এছাড়া তিনি দেশে-বিদেশে ৭০টিরও অধিক দলীয় প্রদর্শনীতে অংশগ্রহন করেছেন।
শিল্পচর্চায় কুন্তল বাড়ৈ পেয়েছেন একাধিক স্বীকৃতিও। ২০২০ সালের ২২তম নবীন চারুকলা প্রদর্শনীতে শ্রেষ্ঠ পুরষ্কার, ২০১৬ সালের ১৭তম এশিয়ান চারুকলা বিয়েনালে সম্মাননা পুরষ্কার তাঁর উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে রয়েছে।
কুন্তল বাড়ৈর শিল্পীসত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর কিউরেটর হিসেবে কাজ। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে আলিয়েন্স ফ্রসেসের লা গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত‘সার্চ সোউল সয়েল’প্রদর্শনীর কিউরেটর ছিলেন তিনি। তার তত্ত্বাবধানে সাতজন সমকালীন নবীন শিল্পীর অংশগ্রহণে আয়োজিত ওই প্রদর্শনীতে মাটি, পরিবেশ, স্মৃতি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং মানব অস্তিত্বের পারস্পরিক সম্পর্ক বিভিন্ন মাধ্যমের শিল্পকর্মের মাধ্যমে অনুসন্ধান করা হয়।
মাটি ও অস্তিত্বের অনুসন্ধান থেকে‘অ্যানাটমি অফ ট্রানসিট’ এ শহর ও চলাচলের অনুসন্ধান—এই দুই প্রদর্শনীর মধ্যে বিষয়গত পার্থক্য থাকলেও কুন্তল বাড়ৈর শিল্পীসত্তার একটি অভিন্ন জায়গা স্পষ্ট। প্রকৃতি, মাটি ও মানুষের সম্পর্ক যেমন তাঁর ভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কংক্রিট, রাস্তা, যানবাহন ও নগরজীবনের মধ্যেও তিনি খুঁজে দেখেন মানুষের অস্তিত্বের সংকট।
‘অ্যানাটমি অফ ট্রানসিট’ তাই কেবল যানজট বা পরিবহনব্যবস্থাকে নিয়ে কোনো দৃশ্যনির্ভর শিল্প-প্রদর্শনী নয়। বরং এটি শহরের ভেতর মানুষের অবস্থান নিয়ে একটি প্রশ্নমালা।
প্রতিদিন যে রাস্তা দিয়ে মানুষ যাতায়াত করে, যে মোড়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে, যে যানবাহনে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দেয়—সেই পরিচিত অভিজ্ঞতার ভেতরেই কুন্তল খুঁজে দেখেছেন পরিচয়, স্মৃতি, বিচ্ছিন্নতা এবং সম্পৃক্ততার অনুভূতি-এর প্রশ্ন।
কুন্তল-এর ঢাকা কোনো স্থির শহর নয়। এটি একটি চলমান শরীর—যার স্পন্দন আছে, চাপ আছে, ব্যথা আছে, আকাঙ্ক্ষা আছে। তার প্রতিটি রাস্তা একটি গল্প বহন করে, প্রতিটি যানবাহন তৈরি করে একটি ক্ষণস্থায়ী ব্যক্তিগত পরিসর, আর প্রতিটি যানজট নাগরিক জীবনের অসংখ্য অপ্রকাশিত গল্পকে পাশাপাশি আটকে রাখে।‘অ্যানাটমি অফ ট্রানসিট’ সেই আটকে থাকা গল্পগুলোর দিকে তাকানোর একটি শিল্পিত আমন্ত্রণ। কুন্তল বাড়ৈর ক্যানভাসে তাই ঢাকা শুধু একটি শহর নয়; এটি একই সঙ্গে অবকাঠামো, অভিজ্ঞতা এবং মানুষের মানসিক ভূগোল।
প্রদর্শনী: Anatomy of Transit
শিল্পী: কুন্তল বাড়ৈ
স্থান: প্লাট-ফর্মস গ্যালারি, বাসা- ১২/ বি, ৫ম তলা, রোড-৫৫, গুলশান-২, ঢাকা-১২১২
উদ্বোধন: ১৫ আগস্ট ২০২৬, সন্ধ্যা ৬টা
প্রদর্শনীর সময়কাল: ১৫ আগস্ট–৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গ্যালারি সময়: সকাল ১১টা–রাত ৮টা
