১০ তলা ভবন ও ৩০ কোটি টাকার ফ্লোর তসরুপের অভিযোগ, ইইউবিতে সনদ বাণিজ্য ও কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ
বেসরকারি ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (ইইউবি)-এর সাবেক ট্রাস্টি বোর্ডের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, সম্পদ তসরুপ, সনদ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি এবং প্রশাসনিক অনিয়মের একাধিক অভিযোগের প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত বোর্ড অব এডমিনিস্ট্রেটরস। এসব অভিযোগের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ বা আর্থিক অনিয়ম, ১০ তলা একটি ভবন এবং প্রায় ৩০ কোটি টাকা মূল্যের একটি ফ্লোর তসরুপের বিষয়ও রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি বোর্ড ভেঙে দিয়ে সম্প্রতি সরকার বোর্ড অব এডমিনিস্ট্রেটরস গঠন করেছে। নতুন বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা দায়িত্ব গ্রহণের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে কাজ শুরু করেছেন।
রোববার (১৯ জুলাই) ‘ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের পূর্ববর্তী ট্রাস্টি বোর্ডের দুর্নীতি-অনিয়ম প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত বোর্ড অব এডমিনিস্ট্রেটরসের প্রাথমিক বক্তব্য’ শীর্ষক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বোর্ডের কো-অর্ডিনেটর মোহাম্মদ তানভীর রহমান স্বাক্ষর করেন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মকবুল আহমেদ খান এবং তার পদত্যাগের পর দায়িত্ব নেওয়া তার ছেলে আহমেদ ফরহাদ খান তানিমের সময় স্বেচ্ছাচারিতা, স্বজনপ্রীতি, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি মারাত্মক সংকটে পড়ে।
বোর্ড অব এডমিনিস্ট্রেটরস জানায়, সাবেক ট্রাস্টি বোর্ড সদস্যদের পারস্পরিক বিরোধ ও অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এ পরিস্থিতিতে আচার্য ও রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তে গত ৫ জুলাই প্রশাসক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় এবং ৭ জুলাই নতুন বোর্ড দায়িত্ব গ্রহণ করে।
তারা দাবি করেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর পূর্ববর্তী প্রশাসনের নিয়োগপ্রাপ্ত কিছু জনবলের অসহযোগিতা সত্ত্বেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) স্বাধীনভাবে তদন্তের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বৈধ ট্রাস্টি বোর্ডের নিবন্ধন আরজেএসসি-তে ছিল না। এছাড়া পূর্ববর্তী ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের ক্ষেত্রেও জালিয়াতির বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী সম্পদ তসরুপের অভিযোগও উঠে এসেছে। এর মধ্যে শ্যামলীর রূপায়ণ শেলফোর্ড ভবনে প্রায় ৯ হাজার বর্গফুট আয়তনের একটি ফ্লোর, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৩০ কোটি টাকা এবং মিরপুর-২-এর শাহ আলীবাগ এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত ১০ তলা একটি ভবনের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আর্থিক হিসাবে বিপুল অঙ্কের গরমিল ও সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্রয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণও পাওয়া গেছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
বোর্ড অব এডমিনিস্ট্রেটরস আরও জানায়, কর, ভ্যাট ও আর্থিক প্রতিবেদন সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই প্রয়োজন। পাশাপাশি অনুমোদিত সংখ্যার অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি, সনদ বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি এবং দীর্ঘ সময়ে মাত্র একটি সমাবর্তন আয়োজনের অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া নিয়োগ, পদোন্নতি ও দায়িত্ব বণ্টনে আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করা, স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব, ভাড়াটিয়া গ্রুপ ব্যবহার করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের অভিযোগও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অযৌক্তিক সুবিধা দেওয়া এবং অন্যদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগও রয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ইউজিসির নির্ধারিত ন্যূনতম জমির চেয়ে কম জমিতে স্থায়ী ক্যাম্পাস পরিচালনা এবং ভবনের প্রয়োজনীয় অনুমোদন না থাকার বিষয়ও প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হয়েছে।
বোর্ড অব এডমিনিস্ট্রেটরস জানিয়েছে, সাধারণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং একটি গ্রহণযোগ্য ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের মাধ্যমে চলমান সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে বলে তারা আশা করছে।
