লিফটে আটকে গেলেই কি আতঙ্ক? জেনে রাখুন কার্যকর উপায়
হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে লিফট থেমে গেল। আলো নিভে গেছে, দরজাও খুলছে না। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেরই বুক ধড়ফড় করতে শুরু করে, ঘাম হয়, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। বিশেষ করে যাঁদের ক্লস্ট্রোফোবিয়া (বদ্ধ জায়গার ভয়) বা প্যানিক অ্যাটাকের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের জন্য এই অভিজ্ঞতা আরও ভয়াবহ হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশিরভাগ আধুনিক লিফট নিরাপত্তা ব্যবস্থা মেনেই তৈরি করা হয়। তাই লিফটে আটকে পড়া মানেই প্রাণসংকট নয়। বরং আতঙ্কিত হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কী করবেন, তা আগে থেকেই জানা থাকলে ভয় অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
লিফটে আটকে গেলে প্রথমে যা করবেন:
১. সাহায্যের সংকেত দিন
লিফটের ভেতরে থাকা অ্যালার্ম (বেল) বোতাম কয়েক সেকেন্ড চেপে ধরুন। এতে নিরাপত্তাকর্মী বা ভবনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বিষয়টি জানতে পারবেন।
২. ইন্টারকম ব্যবহার করুন
অনেক লিফটে ইন্টারকম বা জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকে। সেটি ব্যবহার করে নিরাপত্তারক্ষী বা কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
৩. ফোনে খবর দিন
মোবাইলে নেটওয়ার্ক থাকলে পরিবারের সদস্য, ভবনের নিরাপত্তাকর্মী বা প্রয়োজন হলে জরুরি সেবায় ফোন করুন। কোথায় আটকে আছেন, সেটি স্পষ্টভাবে জানান।
৪. মোবাইলের ব্যাটারি সংরক্ষণ করুন
অন্ধকার হলে কিছু সময়ের জন্য মোবাইলের টর্চ ব্যবহার করুন। তবে অপ্রয়োজনে টর্চ বা ভিডিও চালিয়ে ব্যাটারি নষ্ট করবেন না।
৫. দরজা জোর করে খোলার চেষ্টা করবেন না
নিজে থেকে দরজা খুলতে বা দুই দরজার মাঝখান দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা বিপজ্জনক। লিফট হঠাৎ চালু হলে গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
৬. শান্তভাবে অপেক্ষা করুন
লাফালাফি বা অতিরিক্ত নড়াচড়া করবেন না। সম্ভব হলে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ান অথবা মেঝেতে বসে ধীরে ধীরে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করুন।
উদ্বেগ ও শ্বাসকষ্ট কমানোর কৌশল:
ধীরে ধীরে শ্বাস নিন: প্যানিক শুরু হলে শ্বাস দ্রুত হয়ে যায়। তাই সচেতনভাবে ধীরে শ্বাস নিন।
৪-৪-৪-৪ বক্স ব্রিদিং পদ্ধতি: ৪ সেকেন্ড ধরে শ্বাস নিন। ৪ সেকেন্ড শ্বাস ধরে রাখুন। ৪ সেকেন্ড ধরে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন। আবার ৪ সেকেন্ড অপেক্ষা করুন। এভাবে কয়েক মিনিট চালিয়ে গেলে হৃদস্পন্দন ও উদ্বেগ কমতে শুরু করে।
বিকল্প নাসিকা শ্বাস (অনুলোম-বিলোম): এক নাসারন্ধ্র বন্ধ রেখে অন্য দিক দিয়ে শ্বাস নিন, তারপর দিক পরিবর্তন করে শ্বাস ছাড়ুন। এটি মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
ক্লস্ট্রোফোবিয়া থাকলে কী করবেন?
গভীর শ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে ছাড়ুন। কয়েক দফা পুনরাবৃত্তি করুন। হাত শক্ত করে মুঠো করুন, কয়েক সেকেন্ড পরে ছেড়ে দিন। এভাবে কয়েকবার করলে শরীরের টান কমে নিজেকে মনে করিয়ে দিন—লিফটের ভেতরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকে, তাই অক্সিজেন ফুরিয়ে যাবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। দরজার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে না থেকে চোখ বন্ধ করুন বা অন্যদিকে মনোযোগ দিন। পরিচিত কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলুন অথবা ভয়েস মেসেজ রেকর্ড করুন। মনে মনে ১ থেকে ১০০ পর্যন্ত গুনুন, তারপর উল্টো করে ১০০ থেকে ১ পর্যন্ত গোনার চেষ্টা করুন। এতে মন অন্যদিকে সরে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের অতিরিক্ত পরামর্শ
নিজেকে বাস্তব তথ্য মনে করান: প্যানিক অ্যাটাকের সময় মনে হতে পারে, “আমি দম বন্ধ হয়ে মারা যাব।” বাস্তবে আধুনিক লিফটে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা থাকে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দ্রুত উদ্ধার করা সম্ভব।
অযথা ফোনকল করবেন না: একসঙ্গে অনেককে ফোন না করে একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা ভবনের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকে জানান। এতে ব্যাটারিও সাশ্রয় হবে।
শিশু বা বয়স্ক কেউ থাকলে: তাঁদের সঙ্গে শান্তভাবে কথা বলুন। আতঙ্কিত পরিবেশ তৈরি করবেন না। আপনার শান্ত আচরণ অন্যদেরও স্বাভাবিক থাকতে সাহায্য করবে।
পানির বোতল থাকলে: অল্প অল্প করে পানি পান করতে পারেন। এতে মুখ শুকিয়ে যাওয়ার অনুভূতি কমে এবং উদ্বেগ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে।
সামাজিক মাধ্যমে লাইভে না গিয়ে সাহায্য নিন: অনেকে আতঙ্কে লাইভ শুরু করেন বা ভিডিও ধারণে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এর বদলে জরুরি যোগাযোগে মনোযোগ দিন।
এমন ঘটনায় কী করবেন না: দরজা বা ছাদ ভাঙার চেষ্টা করবেন না। লিফটের ভেতরে লাফালাফি বা জোরে ধাক্কাধাক্কি করবেন না। গুজব বা ভুল ধারণায় আতঙ্কিত হবেন না। শ্বাসকষ্ট বাড়লে অতিরিক্ত দ্রুত শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করবেন না।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন?
যদি লিফট থেকে বের হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে বুক ধড়ফড়, তীব্র উদ্বেগ, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা বারবার এমন ভয় ফিরে আসে, তাহলে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত। নিয়মিত প্যানিক অ্যাটাক বা ক্লস্ট্রোফোবিয়ার ক্ষেত্রে কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (CBT) এবং প্রয়োজন হলে ওষুধের মাধ্যমে সফল চিকিৎসা সম্ভব।
লিফটে আটকে পড়া নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি প্রাণঘাতী পরিস্থিতি নয়। শান্ত থাকা, সঠিকভাবে সাহায্য চাওয়া এবং শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করাই এমন মুহূর্তে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
