৩২ বছর পর সন্ধান মিলল হারিয়ে যাওয়া আছিয়ার
কোনো এক বিকেলে ১৬ বছরের মেয়েটি ঢাকার বাসা থেকে না বলে বেরিয়েছিল বরগুনা যাবে। তারপর আর ফেরেনি। মেয়েটির নাম আছিয়া। দিন গড়িয়েছে, বছর পেরিয়েছে। এক সময় ৩২ বছর হয়ে গেছে। অপেক্ষা করতে করতে মা মারা গেছেন। বোনদের বিয়ে হয়েছে, ভাইয়ের সংসার হয়েছে। কিন্তু ৯০ বছর বয়সী বাবা তমিজ উদ্দিনের বুক থেকে মুছে যায়নি মেয়ের মুখ।
তিন দশকেরও বেশি সময় পর হঠাৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি পোস্ট খুলে দিল সেই হারানো দরজা। জানা গেল, আছিয়া বেঁচে আছেন। শুধু বেঁচেই নেই, পাকিস্তানের মাটিতে তিনি এখন সাত সন্তানের মা। বাবা-মেয়ের মাঝে দূরত্ব এখন শত শত মাইল।
মোবাইলের পর্দায় প্রতিদিন মেয়েকে দেখেন তমিজ উদ্দিন। কথা বলে কখনো হাসেন, কখনো চোখের পানি ফেলেন। কিন্তু ৩২ বছর পর ফিরে পাওয়া মেয়েটিকে এখনো ছুঁয়ে দেখতে পারেননি তিনি। তাই ৯০ বছরের বাবার এখন একটাই আকুতি মরার আগে মাইয়াডারে একবার ছুইয়া দেখতে চাই। আপনারা আমার মাইয়াডারে আইন্না দেন।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে অভাবের তাড়নায় বরগুনা থেকে ঢাকায় গিয়েছিল তমিজ উদ্দিনের পরিবার। মিরপুরের বড়বাগ এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন তারা। দিনমজুরি করে সংসার চালাতেন তমিজ উদ্দিন। ১৯৯৪ সালের এক বিকেলে ১৬ বছর বয়সী আছিয়া বরগুনায় যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে না বলে বের হন। এরপর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। কোথায় গেলেন? কার সঙ্গে গেলেন? বেঁচে আছেন, নাকি কোনো অঘটন ঘটেছে। কোনো প্রশ্নের উত্তর ছিল না পরিবারের কাছে।
অনেক খোঁজাখুঁজির পরও মেয়ের সন্ধান না পেয়ে একসময় গ্রামে ফিরে আসেন তমিজ উদ্দিন পরিবার নিয়ে। কিন্তু আছিয়ার মা রাহেলা মেয়ের ফেরার অপেক্ষা ছাড়েননি। তিন বছর আগে সেই অপেক্ষারও অবসান হয়। মেয়েকে না দেখেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান মা।
৩২ বছর পর একটি ফেসবুক পোস্ট সম্প্রতি পাকিস্তানে থাকা আছিয়ার বড় মেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্ট দেন। সেখানে নিজের পরিচয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশে থাকা নানার পরিচয় ও ঠিকানা দেওয়া হয়। পোস্টটি চোখে পড়ে বরগুনা সদর উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের চারাভাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা রিয়াজ উদ্দিনের।
সন্দেহ থেকেই শুরু হয় খোঁজ। স্থানীয় মুরব্বিদের সঙ্গে কথা বলেন রিয়াজ। পরে আছিয়ার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরিবারের সদস্যদের ছবি পাঠানো হয় পাকিস্তানে। ছবিগুলো দেখেই স্বজনদের চিনে ফেলেন আছিয়া। ৩২ বছর পর হঠাৎ করেই একটি পরিবার জানতে পারেছে তাদের হারিয়ে যাওয়া মেয়েটি আসলে বেঁচে আছেন।
এরপর রিয়াজ উদ্দিনের মোবাইল ফোন হয়ে ওঠে দুই দেশের দুই প্রান্তে বিচ্ছিন্ন একটি পরিবারের সেতু। মোবাইলের পর্দায় মেয়েকে দেখে কাঁদেন বাবা।
চারাভাঙ্গা গ্রামের বাড়িতে এখন তমিজ উদ্দিনের দিন কাটে অপেক্ষায়। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন তিনি। শরীর দুর্বল। তবুও প্রতিবেশী রিয়াজ কখন মোবাইল নিয়ে আসবেন, সেই অপেক্ষায় থাকেন। ফোনের পর্দায় মেয়ের মুখ দেখা দিলেই বদলে যায় বৃদ্ধ বাবার মুখ। কখনো হাসেন। কখনো চুপ করে তাকিয়ে থাকেন। আবার কখনো চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, আল্লাহ আমার মাইয়ার খোঁজ দিছে। এখন মরার আগে ওরে একবার ছুইয়া দেখতে চাই।
৩২ বছর পর মেয়েকে ফিরে পেয়েও যেন পুরোপুরি ফিরে পাননি বাবা। কারণ মেয়েটি এখনো মোবাইলের পর্দার ওপারে।
মোবাইল ফোনে আছিয়া জানান, ১৯৯৪ সালে বরগুনায় যাওয়ার উদ্দেশে ঢাকার বাসা থেকে না বলে বের হয়ে সদরঘাট এলাকায় যান। সেখানে এক নারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ওই নারী তাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে সঙ্গে নিয়ে যায়। পরে তাকে অজ্ঞান করে প্রথমে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয় বলে দাবি করেন আছিয়া।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতে একটি বন্ধ ঘরে তাকে ১০ থেকে ১২ দিন আটকে রাখা হয়। সেখানে আরও কয়েকজন মেয়েও ছিলেন। এরপর তাকে পাকিস্তানের মোজাফফর নগরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ৪০ হাজার পাকিস্তানি রুপিতে তাকে বিক্রি করা হয় বলে দাবি করেন আছিয়া। পরে তার সঙ্গে বিয়ে হয়। আছিয়ার স্বামী স্কুলশিক্ষক ছিলেন। তাদের সংসারে ছয় মেয়ে ও এক ছেলে। স্বামী মারা যাওয়ার পর বাংলাদেশে থাকা বাবা-মা ও স্বজনদের কথা আরও বেশি মনে পড়তে থাকে তার।
আছিয়া বলেন, আমি অনেক চেষ্টা করেও বাড়ির কোনো খোঁজ নিতে পারিনি। এখন পরিবারের সন্ধান পেয়েছি। আমি আমার বাবাকে দেখতে দেশে ফিরতে চাই। তিনি জানান, পাকিস্তানে পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন। দেশে ফিরতে প্রায় চার লাখ পাকিস্তানি রুপি লাগবে বলে জানতে পেরেছেন। কিন্তু এত টাকা তার কাছে নেই। তাই বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সরকারের সহযোগিতা চান তিনি।
আছিয়ার ভাই মোস্তফা বলেন, আমার বোন হারিয়ে গেছে প্রায় ৩২ বছর আগে। এতদিন আমরা তার বেঁচে থাকার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। হঠাৎ জানতে পারলাম, সে বেঁচে আছে। এটা আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য। আমরা চাই, সরকার তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সহযোগিতা করুক।
আছিয়ার সন্ধান পাওয়ার ঘটনায় ভূমিকা রাখা রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ফেসবুকে পোস্টটি দেখে স্থানীয় মুরব্বিদের সঙ্গে কথা বলে তিনি বিষয়টি যাচাই করেন। পরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি বলেন, আমার ফোনের মাধ্যমেই এখন দুই দেশের পরিবারের কথা হয়। আছিয়া তার বাবাকে দেখতে চান। সরকারের কাছে অনুরোধ, তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক।
বরগুনার জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার বলেন, আছিয়া বাংলাদেশের নাগরিক, এমন প্রমাণপত্র থাকলে পাকিস্তানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, ৩২ বছর আগের ঘটনা হওয়ায় নাগরিকত্বের সনদ বা অন্য কোনো প্রমাণপত্র না থাকলে পরিবারের সদস্যরা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে পারেন। বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী আছিয়াকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
