পরকীয়া রুখতে ইসলামের ৮ কার্যকর সমাধান
পরিবার মানবজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র বন্ধন। একটি সুস্থ ও শান্তিপূর্ণ সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে সুশৃঙ্খল পরিবারকে কেন্দ্র করে। আর পরিবারের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো বৈধ ও পারস্পরিক দায়িত্বশীল বৈবাহিক সম্পর্ক।
তবে নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, অশ্লীলতার বিস্তার এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে অবৈধ সম্পর্কের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এসব সম্পর্কের প্রভাব শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; অনেক ক্ষেত্রে তা সন্তান, পরিবার এবং বৃহত্তর সামাজিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ইসলাম বৈবাহিক সম্পর্কের পবিত্রতা রক্ষায় শুধু পরকীয়া বা ব্যভিচার নিষিদ্ধ করেনি; বরং এসব অনৈতিকতার দিকে নিয়ে যেতে পারে—এমন অনেক পথ থেকেও দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে পরকীয়া থেকে বাঁচার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হলো—
১. ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায়—এমন সব পথ এড়িয়ে চলা
ইসলাম শুধু ব্যভিচার নিষিদ্ধ করেনি, বরং তার কাছাকাছি যেতেও নিষেধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ।’(সুরা ইসরা, আয়াত: ৩২)
অর্থাৎ অবৈধ প্রেম, গোপন যোগাযোগ, অশালীন বার্তা আদান-প্রদান, অনৈতিক মেলামেশা কিংবা এমন কোনো আচরণ, যা ধীরে ধীরে হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে ফেলতে পারে—এসব থেকেও সতর্ক থাকা জরুরি।
২. দৃষ্টি সংযত রাখা
অনেক অনৈতিক সম্পর্কের শুরু হতে পারে অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টি ও আকর্ষণ থেকে। তাই ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কেই দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে।’(সুরা নুর, আয়াত: ৩০)
পরের আয়াতে মুমিন নারীদেরও দৃষ্টি সংযত রাখা ও পবিত্রতা রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (সুরা নুর, আয়াত: ৩১)
দৃষ্টি সংযত রাখা মানুষের আত্মসংযম বাড়ায় এবং অনৈতিক আকর্ষণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সহায়তা করে।
৩. পরপুরুষ ও পরনারীর সঙ্গে নির্জনতা এড়িয়ে চলা
ইসলাম নারী-পুরুষের এমন নির্জন অবস্থানকে নিরুৎসাহিত করেছে, যেখানে অনৈতিকতার সুযোগ তৈরি হতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান না করে। কারণ তখন তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।’(তিরমিজি, হাদিস: ২১৬৫)
এই নির্দেশনার উদ্দেশ্য হলো অনৈতিক পরিস্থিতির সম্ভাব্য দরজা আগেই বন্ধ করা।
৪. লজ্জাশীলতা ও আত্মসংযম বজায় রাখা
লজ্জাশীলতা মানুষের চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ গুণ। এটি মানুষকে অশালীনতা ও অনৈতিক আচরণ থেকে বিরত থাকতে সাহায্য করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি শাখা।’(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯)
তাই ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে শালীনতা, সংযম ও নৈতিকতার চর্চা অনৈতিক সম্পর্ক থেকে দূরে থাকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
৫. বৈধ বিবাহকে সহজ করা
ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক চাহিদাকে বৈধ পথে পূরণের জন্য বিবাহকে উৎসাহিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিবাহ সম্পন্ন করে দাও।’(সুরা নুর, আয়াত: ৩২)
বিবাহ শুধু সামাজিক বন্ধন নয়; এটি দায়িত্ব, ভালোবাসা, পারস্পরিক অধিকার ও নৈতিকতার একটি বৈধ কাঠামো। তাই সমাজে বিবাহকে অযথা কঠিন না করে সহজ করার প্রতি ইসলাম গুরুত্ব দিয়েছে।
৬. স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার ও দায়িত্ব পালন করা
দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা, সম্মান, দায়িত্ববোধ ও আন্তরিকতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।’(সুরা রূম, আয়াত: ২১)
পারিবারিক সম্পর্কে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সময় দেওয়া, দায়িত্ব পালন এবং সমস্যাগুলো খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা দাম্পত্য সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে পারে।
৭. অশ্লীলতা ও অপসংস্কৃতি থেকে দূরে থাকা
বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অশালীন ও অনৈতিক কনটেন্ট সহজেই মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এসব ব্যবহারে সংযমী হওয়া এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে দূরে থাকা জরুরি।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা চায় যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’(সুরা নুর, আয়াত: ১৯)
তাই বিনোদন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ইসলামি মূল্যবোধ ও ব্যক্তিগত সংযম বজায় রাখা প্রয়োজন।
৮. তাকওয়া ও আল্লাহভীতি অর্জন করা
পরকীয়া ও অন্যান্য গুনাহ থেকে বাঁচার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিগুলোর একটি হলো তাকওয়া—অর্থাৎ আল্লাহর উপস্থিতি ও জবাবদিহির অনুভূতি নিয়ে জীবনযাপন করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন।’(সুরা তালাক, আয়াত: ২)
মানুষ যখন মনে রাখে যে তার প্রকাশ্য ও গোপন সব কাজই আল্লাহর কাছে জবাবদিহির আওতায়, তখন আত্মসংযম ও নৈতিকতার চর্চা সহজ হয়।
পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীলতা, পারস্পরিক সম্মান, দৃষ্টি ও আচরণে সংযম এবং আল্লাহভীতির চর্চা দাম্পত্য সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পবিত্র ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন এবং হারাম সম্পর্ক থেকে দূরে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
