নারী কৃষকের জন্য সুনির্দিষ্ট অভিযোজন অর্থায়নের দাবি
কপ-৩১-এ নতুন প্রতিশ্রুতির চেয়ে বিদ্যমান জলবায়ু প্রতিশ্রুতির কার্যকর বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা পর্যাপ্ত, সহজলভ্য ও অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর নতুন ঋণের বোঝা না চাপানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে অভিযোজন অর্থায়ন তিনগুণ করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, লস অ্যান্ড ড্যামেজের অর্থায়ন দ্রুত ও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং ফসিল ফুয়েল থেকে ন্যায়সংগত উত্তরণে অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের দাবি জানানো হয়।
বক্তারা বলেন,অভিযোজনের অগ্রগতি নির্ধারণ ও মূল্যায়নে যাদের জন্য অভিযোজন, তাদেরই অর্থবহভাবে যুক্ত করতে হবে। হয়। জলবায়ু সংকটে নারী কৃষকের উৎপাদন ও আয়ের পাশাপাশি সুপেয় পানি,নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে উল্লেখ করে তাদের শুধু ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী নয়, স্বতন্ত্র উৎপাদনকারী ও অর্থনৈতিক অংশীজন হিসেবে স্বীকৃতির দাবি জানানো হয়। কৃষি অভিযোজনের অর্থায়নের কত অংশ নারী কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে তা আলাদাভাবে ট্র্যাক করার পাশাপাশি উৎপাদন, আয়, সম্পদে নিয়ন্ত্রণ, ক্ষয়ক্ষতি, সময়-শ্রমের বোঝা ও অভিযোজন সক্ষমতায় বাস্তব পরিবর্তন পরিমাপের আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে নারী কৃষকের জন্য সরাসরি ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, উৎপাদন সম্পদ, প্রযুক্তি, বাজার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমান প্রবেশাধিকার, লবণাক্ততা মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ এবং নারী কৃষিশ্রমিকের সমকাজে সমমজুরি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
১৫ অক্টোবর ২০২৬, ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে ইক্যুইটিবিডি,বিসিজেএফ, কোস্ট ফাউন্ডেশন, আভাস, বিন্দু ও স্ট্রিট চাইল্ড-এর যৌথ আয়োজনে “কপ-৩১ ও বাংলাদেশের অগ্রাধিকার: জলবায়ু সংকট, কৃষি ও নারী; অভিযোজন, অর্থায়ন ও ন্যায্যতা” শীর্ষক সেমিনারে এসব দাবি তুলে ধরেন। কোস্ট ফাউন্ডেশনের পরিচালক মোস্তফা কামালের সঞ্চালনায় সেমিনারে বক্তব্য রাখেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ উইংয়ের প্রধান বীজ প্রযুক্তিবিদ ড. মো. আক্তার হোসাইন খান, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী, অ্যাডব-এর নির্বাহী পরিচালক একেএম জসিমউদ্দিন, আভাসের নির্বাহী পরিচালক রহিমা সুলতানা কাজল; স্ট্রিট চাইল্ড বাংলাদেশের কান্ট্রি লিড ইমতিয়াজ হৃদয়; এনভায়রনমেন্ট জার্নালিস্ট ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মো. মোতাহার হোসেন; এসএ টিভির সাংবাদিক মো. সালাউদ্দিন বাবু এবং সুন্দরবন সুরক্ষা কমিটির সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র, ইক্যুইটিবিডির সমন্বয়ক আমিনুল হক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এর আহসানুল ওয়াহদে, বিডিসিএসও প্রসেস এর ওমর ফারুখ ও ইকবাল উদ্দিন, ওয়াটার কিপারস এর ইকবাল ফারুখ, গ্রীন ভয়েস এর হুমায়ন কবির সুমন, হৃদা বাংলাদেশ এর গোলাম মোরশেদ, ইয়থ অ্যাকশন ডেভোলাপ্যমন্ট এর আরফাত,আভাস এর মনিরুজ্জামান , বিন্দু থেকে শাহিনুর ইসলাম, স্ট্রিট চাইল্ড এর ক্রিস্টিনা বারোই হিয়া, ওএবি ফাউন্ডেশন এর তুহিন কুয়াকাটা থেকে আগত নারী কৃষক নুর নাহার বেগম, রিনা বেগম সাতক্ষীরা থেকে কল্পনা রানী ও নাজমা বেগম এছাড়াও বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, যুব প্রতিনিধি, সাংবাদিকরা আলোচনায় অংশ নেন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের হেড–জলবায়ু পরিবর্তন এম. এ. হাসান।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ উইংয়ের প্রধান বীজ প্রযুক্তিবিদ ড. মো. আক্তার হোসাইন খান বলেন, তৃনমূলের ছোট ছোট সংগঠনগুলো একত্রিত হয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করতে পারে, সরকার স্থানীয়ভাবে ছোট ছোট হিমাগার তৈরির উদ্যোগ নেবে, জলবায়ু সহনশীল বীজ উদ্ভাবন করা হচ্ছে এবং সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মীর মোহামদ আলী বলেন, কার্বন ট্রেডিং এর নামে আমরা উন্নত বিশ্বকে গ্রীন হাউজ গ্যাস নি:স্বরনের বৈধতা দিয়ে দিচ্ছি কিনা এটা ভাবতে হবে।
আভাসের নির্বাহী পরিচালক রহিমা সুলতানা কাজল বলেন, স্থানীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ও কৃষি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী কৃষকের অর্থবহ অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। কোস্ট ফাউন্ডেশন এর পরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, কৃষিখাতে নারী শ্রমিকের শ্রমের মূল্যায়ন ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। সমকাজে সমমজুরি নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করে নারী ও পুরুষ কৃষিশ্রমিকের মজুরি বৈষম্য দূর করতে হবে।
অ্যডাব এর নির্বাহী পরিচালক জসিম উদ্দিন বলেন,যারা কপের নেগোশিয়েশন টিমে থাকেন তাদের আরো সরব হতে হবে, আমদের কৃষি প্রধান অর্থনীতি অথচ উন্নয়ন পরিকল্পনা কৃষিকে কেন্দ্র করে হয়নি। আমরা সবসময় সংখ্যা ভিত্তিক ফলাফল নিয়েই আছি কিন্তু কি ধরনের গূণগত পরিবর্তন হচ্ছে সেখানে গুরুত্ব দেই না।
স্ট্রিট চাইল্ড–বাংলাদেশের টিম লিডার ইমতিয়াজ হৃদয় বলেন, আমাদের পলিসিতে নারী কৃষক বলতে কিছ নেই, সেটা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, উপজেলা পর্যায়ে নারী কৃষকদের জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করতে হবে এবং সেটা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতায় হতে হবে যাতে নারী কৃষকরা অন্যান্য দপ্তরের সুযোগ সুবিধা এক জায়গা থেকে গ্রহণ করতে পারে।
ইকুইটিবিডির সমন্বয়ক সৈয়দ আমিনুল হক বলেন, কপ-এ জলবায়ু অর্থায়নের অন্তত ৫০% অভিযোজন খাতে নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য দেশে অভিযোজন অর্থায়নের কার্যকর ব্যবহার ও সফলতার উদাহরণ তৈরি করে সরকারের অবস্থান শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু নীতি ও কৌশলে পরিবর্তন এনে বটম-আপ পদ্ধতিতে বিপদাপন্ন জনগোষ্ঠীর চাহিদা ও অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
গ্রীন ভয়েস এর হুয়ামন কবির সুমন বলেন, গ্রীন হাউজ গ্যাস নি:সরনের জন্য যারা বেশি দায়ি সে রাস্ট্রগুলোকে তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের দাবি জোড়ালো করতে হবে। সুন্দরবন রক্ষা আন্দোলন এর নিখিল চন্দ্র ভদ্র বলেন,দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় নারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এর আহসানুল ওয়াহদে বলেন, বিনিয়োগ ভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন থেকে সরে এসে অনুদান ভিত্তিক অর্থায়ন করতে হবে নতুবা বিপদাপন্ন দুর্বল অর্থনীতির দেশের জলবায়ু ঋন বাড়বে। নারী বান্ধব বাজেট বরাদ্দ ও তা কার্যকরীভাবে ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা ট্রেক করা জরুরী।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় কোস্ট ফাউন্ডেশনের হেড–ক্লাইমেট চেঞ্জ এম. এ. হাসান বলেন, কপ-৩১-কে জলবায়ু অর্থায়নে প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নে যেতে হবে, যাদের জন্য অভিযোজন, অভিযোজনের অগ্রগতি নির্ধারণ ও মূল্যায়নে তাদের যুক্ত করতে হবে। এনভায়রনমেন্ট জার্নালিস্ট ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মো. মোতাহার হোসেন বলেন, জলবায়ু সংকট নারী কৃষকের জন্য শুধু উৎপাদন ও আয়ের সংকট নয়—পানি, সময়, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়াচ্ছে সেজন্য সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
