যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের পর এবার বৃষ্টির আঘাত, গাজায় প্লাবিত ৭০ হাজার তাঁবু
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ভারি বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় অন্তত ৭০ হাজার তাঁবু প্লাবিত হয়েছে। এতে বাস্তুচ্যুত হাজারো পরিবার নতুন করে আশ্রয়সংকটে পড়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত উপত্যকায় অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি ও উদ্ধার সরঞ্জামের সংকটের কারণে পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া ঝড়-বৃষ্টিতে গাজার বিভিন্ন স্থানে কয়েক ডজন ভবনের দেয়ালও ধসে পড়েছে। গাজার সরকারি গণমাধ্যম কার্যালয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এ দুর্যোগে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০ লাখ ডলার।
চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইসরায়েলের হামলায় আগে ক্ষতিগ্রস্ত দুটি ভবনের দেয়াল ঝড়ের সময় ধসে পড়ে। এ ছাড়া একটি ভবনের ঢেউটিন উড়ে গিয়ে পাঁচ ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন।
গাজা সিটি পৌরসভার মুখপাত্র হোসনি মুহান্না বলেন, যেসব পরিবারের তাঁবু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের থাকার মতো বিকল্প কোনো জায়গা নেই। প্রায় ১০ লাখ বাসিন্দা ও বাস্তুচ্যুত মানুষ গাজা সিটির মাত্র ৩০ শতাংশ এলাকায় গাদাগাদি করে বসবাস করছেন। এতে যুদ্ধের কারণে আগে থেকেই বিধ্বস্ত অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
মুহান্না জানান, ১২ ঘণ্টায় গাজা সিটিতে ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা শহরটির বার্ষিক মোট বৃষ্টিপাতের প্রায় ১৫ শতাংশ। প্রবল বাতাসে অনেক তাঁবু উড়ে গেছে, কিছু ছিঁড়ে গেছে। বৃষ্টির পানিতে প্লাবিত হয়েছে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলো।
তিনি বলেন, জলাবদ্ধ সড়ক, ভূমিক্ষয় ও নালা বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়ে পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে ২৫০টি অভিযোগ এসেছে। সীমিত সামর্থ্য নিয়েই অধিকাংশ এলাকায় সাড়া দিয়েছেন পৌরসভার কর্মীরা।
গাজা সিটির ২৭০টি শরণার্থীশিবির ও আশ্রয়কেন্দ্র বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে বলেও সতর্ক করেছেন মুহান্না। যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শহরটির পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার সক্ষমতা কমে মাত্র ২০ শতাংশে নেমেছে। ফলে নিচু এলাকাগুলোতে বন্যার ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
শীতকালীন সামগ্রী, ত্রাণ ও ভারী সরঞ্জাম গাজায় পৌঁছাতে সীমান্ত ক্রসিংগুলো সম্পূর্ণ খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
গাজার সিভিল ডিফেন্সের জনসংযোগ পরিচালক আবদুল্লাহ আল-মাজদালাউই জানান, ঝড় শুরু হওয়ার পর থেকে উদ্ধারকর্মীরা শত শত বিপৎসংকেত পেয়েছেন। অধিকাংশ ফোন এসেছে পানিতে ডুবে যাওয়া তাঁবু ও শিবির এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর আশ্রয়স্থলের ওপর ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা ভবন ও দেয়াল নিয়ে।
তিনি বলেন, তাৎক্ষণিক প্রাণহানির ঝুঁকি মোকাবিলা করতে পারলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে নতুন আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সক্ষমতা তাঁদের নেই।
এর আগে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ জানায়, গাজার ১৯ লাখ ৮০ হাজার মানুষের, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯৪ শতাংশের আশ্রয় ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী প্রয়োজন। সংস্থাটির জুন মাসে পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী, তাদের মধ্যে ৫৮ শতাংশের আশ্রয়সংকট গুরুতর বা বিপর্যয়কর পর্যায়ে রয়েছে।
গত অক্টোবর মাসে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক কার্যালয় (ওসিএইচএ) সতর্ক করে জানায়, গাজার প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনি এমন বাস্তুচ্যুত শিবিরে বসবাস করছেন, যেগুলো মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাঁদের মধ্যে চার লাখের বেশি মানুষ উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রয়েছেন।
২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া ইসরায়েলের যুদ্ধে গাজার অসংখ্য বাড়িঘর ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার এক বছরের বেশি সময় পার হলেও আশ্রয় ও পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা পূরণে পর্যাপ্ত সহায়তা পৌঁছায়নি।
অস্থায়ী আবাসন নির্মাণ ও বাড়িঘর মেরামতের প্রয়োজনীয় সামগ্রী গাজায় প্রবেশে বিধিনিষেধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে শীত ও বৃষ্টির মধ্যে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর দুর্ভোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সূত্র – আনাদোলু এজেন্সি
