মূল লেখায় যান
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ৩:৫৫ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
বদলি বাতিল না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে, অনড় জামালপুর নার্সিং শিক্ষার্থীরা এইমাত্রঅন্যান্য বদলি বাতিল না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে, অনড় জামালপুর নার্সিং শিক্ষার্থীরা বরগুনায় দুর্গাপূজার নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি ডিআইজির এইমাত্রঅন্যান্য বরগুনায় দুর্গাপূজার নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি ডিআইজির সাবেক এসবি প্রধান মনিরুল ও পরিবারের ৮৩ ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ এইমাত্রঅন্যান্য সাবেক এসবি প্রধান মনিরুল ও পরিবারের ৮৩ ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ ধর্ষণ প্রতিরোধে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার কঠিন পরীক্ষা এইমাত্রঅন্যান্য ধর্ষণ প্রতিরোধে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার কঠিন পরীক্ষা হরমুজে ডুবল পণ্যবাহী জাহাজ, সাগরে ভাসছে আইফোন ও দামি সুগন্ধি এইমাত্রঅন্যান্য হরমুজে ডুবল পণ্যবাহী জাহাজ, সাগরে ভাসছে আইফোন ও দামি সুগন্ধি ফরিদপুরে ৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণের দায়ে যুবকের মৃত্যুদণ্ড এইমাত্রঅন্যান্য ফরিদপুরে ৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণের দায়ে যুবকের মৃত্যুদণ্ড সখীপুরে ১৩ বছরের কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, গ্রেপ্তার ২ এইমাত্রঅন্যান্য সখীপুরে ১৩ বছরের কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, গ্রেপ্তার ২ শারদীয় দুর্গাপূজা: নড়াইলে ৫৪৩টি মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্ততি এইমাত্রঅন্যান্য শারদীয় দুর্গাপূজা: নড়াইলে ৫৪৩টি মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্ততি
বাংলাদেশ

দলমত নির্বিশেষে ভাগ হলো সোনাদিয়ার প্যারাবন

প্রতিবেদক: বাংলা ব্রিফ
দলমত নির্বিশেষে ভাগ হলো সোনাদিয়ার প্যারাবন

মহেশখালীর ঘটিভাঙ্গা ঘাট থেকে নৌকা ভাসিয়ে সোনাদিয়ার দিকে এগোলে প্রথমেই চোখে পড়ে খালের দুই পাশ ঘিরে রাখা দীর্ঘ মাটির বাঁধ। দূর থেকে দেখলে ভ্রম হতে পারে নতুন কোনো সড়ক বা স্থাপনা তৈরি হচ্ছে বুঝি। কিন্তু বাঁধ পার হয়ে একটু এগোলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। যেখানে একসময় ছিল ঘন প্যারাবন- কেওড়া আর বাইনের সারি, লাল কাঁকড়ার দল, পাখির কলরব- সেখানে আজ শুধু পড়ে আছে শুকনো শেকড়, পোড়া ডালপালা আর কাটা গুঁড়ির স্তূপ। সবুজের জায়গা নিয়েছে সারি সারি মাছের ঘের। ১০ হাজার একরের একটি বন এখন কেবল স্মৃতি।

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার পশ্চিমে অবস্থিত সোনাদিয়া দ্বীপ পরিচিত লাল কাঁকড়া, কাছিম আর বিরল প্রজাতির পাখির আবাসস্থল হিসেবে। এই বিশেষত্বের কারণেই সরকার দ্বীপটিকে ঘোষণা করেছিল ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ বা ইসিএ- অর্থাৎ আইনের ভাষায়, এখানকার মাটি, পানি বা প্রাকৃতিক পরিবেশে কোনো পরিবর্তন বা বাণিজ্যিক রূপান্তর নিষিদ্ধ। তারপরও ইকোট্যুরিজম পার্ক গড়ার নামে গত আওয়ামী লীগ সরকার ৯ হাজার ৪৬৬ দশমিক ৯৩ একর বনভূমি তুলে দেয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)-র হাতে- মূল্য ধার্য হয় মাত্র ১ হাজার ১ টাকা। ২০১৭ সালের মে মাসে উপকূলীয় বন বিভাগের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জমি বুঝে নেয় বেজা। কিন্তু এরপর বছরের পর বছর কেটে গেলেও ইকোট্যুরিজমের নামে দৃশ্যমান কোনো কাজ হয়নি সেখানে। যা হয়েছে, তা সবুজ ধ্বংসের ইতিহাস।

২০২৬ সালের জুনে এসে দেখা যায়, সেই প্যারাবনের আর কোনো অস্তিত্ব নেই। বাইন-কেওড়াসহ নানা প্রজাতির ম্যানগ্রোভ গাছ উধাও- সাক্ষী হয়ে পড়ে আছে শুধু শুকনো শেকড় আর বাগল।

বাঁধের আড়ালে চলছে নিঃশব্দ ধ্বংসযজ্ঞ:

সরেজমিনে ঘটিভাঙ্গা ঘাট থেকে পূর্ব ও পশ্চিমমুখী খাল ধরে এগোলে দুই পাশে দেখা মেলে এই মাটির বাঁধের। ভেতরে ঢুকলে স্পষ্ট হয় ধ্বংসের ব্যাপ্তি।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ঘটিভাঙ্গা থেকে সোনাদিয়া পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রায় ১০ হাজার একর প্যারাবন কেটে তৈরি হয়েছে চিংড়ি ঘের, যেখানে মে মাস পর্যন্ত ছিল লবণের মাঠ। এই বিশাল এলাকায় কম করে হলেও একশটি মাছের ঘের গড়ে উঠেছে।

স্থানীয়রা জানান, একই জমির দ্বৈত ব্যবহার চলে ঋতুভেদে- শুষ্ক মৌসুমে লবণ উৎপাদন, বর্ষায় চিংড়ি চাষ। কোথাও কোথাও এখনও চলছে গাছ কাটা, কোথাও বনভূমি সাফ করতে আগুনে পোড়ানো হচ্ছে গাছপালা।

কক্সবাজারের পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস)-এর চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক বলেন, প্যারাবন শুধু গাছের সমষ্টি নয়, এটি উপকূল রক্ষার প্রাকৃতিক দেয়াল। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সামুদ্রিক ঢেউয়ের আঘাত থেকে উপকূলীয় জনপদকে রক্ষা করে এই বন। তার কথায়, কেওড়া-বাইন গাছ মাটি ধরে রাখে; এগুলো কাটা পড়লে ভূমিক্ষয় বাড়ে, খাল-নদীতে পলি জমার ধরন বদলায়, ব্যাহত হয় জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ। সেই সঙ্গে ধ্বংস হয় মাছ, কাঁকড়া, পাখি ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থল। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের উপকূলে এই বন উজাড়ের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা পরিবেশবিদদের।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য, বন কেটে লবণ মাঠ বা চিংড়ি ঘের তৈরির পেছনে জড়িত প্রভাবশালী একাধিক মহল। রাজনৈতিক পরিচয়ে ভিন্নতা থাকলেও এ বিষয়ে তাদের মধ্যে অলিখিত সমঝোতা আছে বলে অভিযোগ আছে- যার ফলে প্রকাশ্যে প্রতিবাদের সাহস দেখান না কেউ। ঘটনার পর বনবিভাগের পক্ষ থেকে দায়ের হওয়া মামলার এজাহার বিশ্লেষণ করলে বেরিয়ে আসে ক্ষমতার জটিল বুনন। মামলার ৮ নম্বর আসামি জামায়াত নেতা ছৈয়দুল হক সিকদার, যিনি আবার ৭ নম্বর আসামি ও মহেশখালী উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল করিমের ভগ্নিপতি। চিংড়ি ঘেরের শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আজিজুল করিম জয়ের নিজের দুটি ঘের রয়েছে সেখানে- তিনি সাজেদুল করিমেরই ছোট ভাই, যদিও মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে জয় কোনো ঘের থাকার কথা অস্বীকার করেন। জয় ও সাজেদুলের চাচাতো ভাই, আওয়ামী লীগ কর্মী জাহাঙ্গীরের আছে একাধিক ঘের; আরেক চাচাতো ভাই রহমতুল্লাহরও আলাদা ঘের।

মামলার ৬ নম্বর আসামি মো. শমসের সাবেক আওয়ামী লীগ এমপি আশেক উল্লাহ রফিকের আপন ফুফাতো ভাই- তার ঘেরের পাশেই রয়েছে আরেকটি বিশাল ঘের। ১১ নম্বর আসামি কাইছার সিকদার বর্তমান উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুবক্কর ছিদ্দিক ও সাবেক মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা মকছুদ মিয়ার ছোট ভাই। ৫ ও ৯ নম্বর আসামি মোস্তফা আনোয়ার ও মহসিন আনোয়ার সাবেক উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মরহুম আনোয়ার পাশা চৌধুরীর ছেলে। আর ১৩ নম্বর আসামি শাহেদ সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিনের ছোট ভাই।

স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধেও অভিযোগ আছে- তারা স্থানীয় পেশিশক্তি কাজে লাগিয়ে প্যারাবন কেটে লবণের মাঠ তৈরি করছেন। এই তালিকায় আছেন যুবলীগের সহ-সাধারণ সম্পাদক ও কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ কামাল, ইউপি সদস্য ছিদ্দিক রিমন, জয়নাল মেম্বার, একরাম মেম্বার প্রমুখ।

পরিবেশকর্মী রুহুল আমিনের ভাষ্য, এই মামলায় জড়িত বা প্যারাবন কাটায় সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত- সব দলের লোকজনই আছেন।

তার দাবি, মামলায় আরও অনেক রাঘববোয়াল বাদ পড়েছেন, এবং যাদের নাম এসেছে তাদের অনেকেই ইতিমধ্যে হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন।

গত ৪ জুন কুতুবজোম ইউনিয়নের ঘটিভাঙ্গা এলাকার প্যারাবনে আগুন জ্বলতে দেখা যায়, যা নিয়ন্ত্রণে আসে ৭ জুন। স্থানীয়দের অভিযোগ, দখলদাররা কেরোসিন ঢেলে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগিয়েছে, যাতে দ্রুত বন পরিষ্কার করে জমি দখল করা যায়। আরও ভয়ংকর তথ্য হলো, প্যারাবন নিধনকারীরা এখন সশস্ত্র পাহারা বসিয়ে কাজ চালাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের- সাধারণ মানুষ এখন সেখানে যেতেও পারছে না।

বনবিভাগের মহেশখালী গোরকঘাটা রেঞ্জ কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন বলেন, বেজার হাতে থাকাকালীনই বেশিরভাগ প্যারাবন কাটা হয়েছে। বনবিভাগকে ৫ হাজার একর জায়গা ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও তা এখনও বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। তার ভাষায়, ঘের কেটে দেওয়ার পক্ষে এখনও স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই; আর ঘের কেটে দেওয়া হলেও বাঁধের কারণে জমে থাকা পলির জন্য সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা স্বাভাবিকভাবে প্রবেশ না করলে নতুন বনায়নও কার্যকর হবে না।

মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান মাহমুদ ডালিম জানান, আগেও অভিযান চালানো হয়েছে, নতুন ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, সোনাদিয়ার প্যারাবন নিধনের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৫৩ দখলদারের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর, এবং দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হবে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার হননি।

মামলা আছে, গ্রেপ্তার নেই:

পরিবেশ সংশ্লিষ্টদের মতে, সোনাদিয়ার গল্পটা শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায় একটি পরিচিত বৃত্তে- আইন আছে, মামলা আছে, কিন্তু জবাবদিহি নেই। এক টাকায় হাতবদল হওয়া একটি সংরক্ষিত বনভূমি কীভাবে দলমত নির্বিশেষে স্থানীয় প্রভাবশালীদের ভাগ-বাঁটোয়ারার জমিতে পরিণত হলো, সোনাদিয়া তার জ্যান্ত দৃষ্টান্ত। ৫৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হলেও একজনও গ্রেপ্তার না হওয়া প্রমাণ করে, এখানে শক্তির সমীকরণ আইনের চেয়ে বড়। আর যতদিন এই সমীকরণ অটুট থাকবে, সোনাদিয়ার মতো আরও দ্বীপ আর উপকূল হারাতে থাকবে তাদের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ- একটি একটি করে।