ইসরায়েল-আমিরাতের গোপন অস্ত্র সহযোগিতার নতুন তথ্য ফাঁস
ইসরায়েলের অন্যতম বড় অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘এলবিট সিস্টেমস’-এর কিছু গোপন নথি ফাঁস হয়েছে। এসব নথির বরাত দিয়ে ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা আগের চেয়ে অনেক গভীর হয়েছে।
ফাঁস হওয়া নথি অনুযায়ী, আমিরাত ইসরায়েলের কাছ থেকে ছয়টি অত্যাধুনিক ‘হার্মিস ৯০০’ ড্রোন জরুরি ভিত্তিতে কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে এই ড্রোন ‘কোখাভ’ বা ‘তারা’ নামে পরিচিত। পরে ড্রোনের সংখ্যা বাড়িয়ে ৪৫টি করার পরিকল্পনাও রয়েছে। ১৫টি পূর্ণাঙ্গ সিস্টেমের আওতায় এই প্রকল্পের সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।
শুধু ড্রোন নয়, ‘ইয়াসমিন ৩’ নামে আরেকটি অস্ত্র প্রকল্পের তথ্যও সামনে এসেছে। এতে মাত্র তিন মাসে ৬ হাজার গাইডেড কিট তৈরির পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। এসব কিট সাধারণ বোমাকে জিপিএস বা লেজার প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার উপযোগী করে তুলতে পারে।
কেন ইসরায়েলের দিকে ঝুঁকছে আমিরাত?
এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
প্রথমত, ২০২২ সালের আবুধাবি হামলা।
২০২২ সালের ১৭ জানুয়ারি ইয়েমেনের সেনাবাহিনী আবুধাবিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। ওই ঘটনায় তিনজন নিহত হন। হামলাটি আমিরাতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কিছু দুর্বলতাও সামনে নিয়ে আসে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর মাত্র দুই মাস পর আমিরাত ইসরায়েলের কাছে হার্মিস ৯০০ ড্রোন কেনার জন্য জরুরি অনুরোধ জানায়। অর্থাৎ, ওই হামলার পর থেকেই আমিরাত দূরপাল্লার নজরদারি ও আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
দ্বিতীয়ত, ২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তি।
২০২০ সালে আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে আমিরাত ও ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। এরপর দুই দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি সামরিক সহযোগিতাও বাড়তে থাকে।
ফাঁস হওয়া নথি ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সাম্প্রতিক ইরান-সংক্রান্ত সংঘাতের সময় এই সহযোগিতা আরও জোরদার হয়েছে। আমিরাতে ইসরায়েলি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের খবরও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে।
এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনাকাটার জন্য যৌথ তহবিল গঠনের উদ্যোগও সামরিক সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তৃতীয়ত, উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন।
আমিরাত এমন ড্রোন চায়, যা দেশের সীমানার বাইরে নজরদারি করতে পারে এবং তাদের দিকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের উৎক্ষেপণ শনাক্ত করতে সক্ষম।
হার্মিস ৯০০ এ ধরনের নজরদারি ও গোয়েন্দা কাজে ব্যবহার করা যায়। একই সঙ্গে আমিরাত ইসরায়েলি প্রযুক্তির কিছু অংশ দেশে উৎপাদনের বিষয়েও আগ্রহী বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি দেশটির নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কী ধরনের অস্ত্র কিনতে চায় আমিরাত?
হার্মিস ৯০০ ড্রোন:
হার্মিস ৯০০ মূলত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি এবং বিভিন্ন সামরিক অভিযানে ব্যবহারের জন্য তৈরি। সহায়ক সরঞ্জামসহ প্রথম ছয়টি ড্রোনের মূল্য প্রায় ১৮০ মিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে আধুনিকায়নের কারণে সেই মূল্য বেড়ে প্রায় ২২৫ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
ভবিষ্যতে ড্রোনের সংখ্যা ৪৫টিতে উন্নীত করা হলে পুরো প্রকল্পের মূল্য প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
‘ইয়াসমিন ৩’ প্রকল্প:
এই প্রকল্পের আওতায় তিন মাসে ৬ হাজার গাইডেড কিট তৈরির পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। এসব কিট সাধারণ বোমাকে নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার মতো গাইডেড অস্ত্রে পরিণত করতে পারে।
এ ছাড়া আমিরাতের চাহিদার তালিকায় সিগন্যাল গোয়েন্দা বিমান, ‘স্কাইস্ট্রাইকার’ লোটারিং মিউনিশন, এমপিআর-২০০০ বাঙ্কার-ভেদী বোমা এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধের বিভিন্ন সরঞ্জামের কথাও রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে এর প্রভাব কী হতে পারে?
ইসরায়েলি অস্ত্র ও প্রযুক্তি আমিরাতের সামরিক সক্ষমতা বাড়ালে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে ড্রোন, গোয়েন্দা প্রযুক্তি ও নির্ভুল-নির্দেশিত অস্ত্রের ক্ষেত্রে আমিরাতের সক্ষমতা অনেক বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
ইরানকে ঘিরে সহযোগিতা বাড়ছে?
এই সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইরান। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইসরায়েল ও আমিরাতের সামরিক সহযোগিতার একটি বড় অংশ ইরানকে ঘিরে তাদের নিরাপত্তা উদ্বেগের সঙ্গে সম্পর্কিত।
আমিরাতে ইসরায়েলি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন হয়ে থাকলে তা ইরানকে মোকাবিলায় ইসরায়েলের বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কাঠামোর সঙ্গে আমিরাতের সমন্বয় বাড়াতে পারে।
এ ছাড়া প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আমিরাতের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছেও অনুরোধ করা হয়েছিল।
তবে এসব দাবির সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং এগুলোর কিছু তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল।
ইরানের জন্য কী বার্তা?
ইসরায়েল ও আমিরাতের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা আরও বাড়লে ইরানের জন্য এটি অবশ্যই একটি নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে নির্ভুল-নির্দেশিত অস্ত্র, দূরপাল্লার নজরদারি ড্রোন এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে উপসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, একটি আরব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের এত ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক অন্যান্য আরব দেশগুলোর মধ্যেও নতুন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা হিসাব তৈরি করতে পারে।
সৌদি আরবসহ অন্য দেশগুলোর ওপর প্রভাব
আমিরাত যদি ইসরায়েলি অস্ত্রের মাধ্যমে সামরিক সক্ষমতা দ্রুত বাড়াতে থাকে, তাহলে সৌদি আরবসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশও নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে যেতে পারে।
এর ফলে আঞ্চলিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে অন্যান্য আরব দেশের ওপরও নতুন করে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে।
ফাঁস হওয়া নথিগুলো থেকে যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক সম্পর্ক শুধু অস্ত্র কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত নিরাপত্তা সহযোগিতায় রূপ নিচ্ছে।
হার্মিস ৯০০ ড্রোন, নির্ভুল-নির্দেশিত অস্ত্র এবং উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি আমিরাতের হাতে গেলে দেশটির সামরিক সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ইসরায়েল-আমিরাতের এই সামরিক সহযোগিতা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং নিরাপত্তা জোটের পুনর্বিন্যাস ঘটাবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সূত্র-পার্সটুডে।
