নামজারি করে দেওয়ার বিনিময়ে ঘুস নিলেন ৯ শতক জমি
আদালতের ডিক্রি হাতে ছিল জমির মালিকের। কক্সবাজার মৌজায় নিজের ৩০ শতক জমির নামজারি করাতে তাই সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেখানে সরকারি সেবাটি যেন আর সরকারি থাকল না। নামজারি করে দেওয়ার বিনিময়ে তার কাছে দাবি করা হয় জমি।
শেষ পর্যন্ত ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল একটি অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলে ৯ শতক জমি লিখে দেন তিনি। সেই জমি আবার সরাসরি কোনো সরকারি কর্মকর্তার নামে নয়। তিন ভাগে ৩ শতক করে জমি যায় তিনজনের স্বজনের নামে। সাত বছর পর সেই জমি নেওয়ার অভিযোগই গড়িয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায়।
নামজারি করে দেওয়ার বিনিময়ে ঘুস হিসেবে ৯ শতক জমি লিখে নেওয়ার অভিযোগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের উপসচিব ও কক্সবাজার সদর উপজেলার সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) পঙ্কজ বড়ুয়াসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে দুদক।
মঙ্গলবার ঢাকায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংস্থাটির সহকারী পরিচালক তানজীর আহমেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ায় মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, কক্সবাজার মৌজার ৩০ শতক জমির মালিক আদালত থেকে ডিক্রি পাওয়ার পর জমিটির নামজারি খতিয়ান করার জন্য প্রয়োজনীয় রেকর্ডপত্র জমা দেন। সাধারণ নিয়মে এরপর সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নামজারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগ হলো, নামজারি করে দেওয়ার বিনিময়ে জমির মালিকের কাছে জমি দাবি করা হয়। পরিস্থিতির একপর্যায়ে তিনি ৯ শতক জমি লিখে দিতে সম্মত হন। ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিলের মাধ্যমে ওই জমি হস্তান্তর করা হয়।
দুদকের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৯ শতক জমির মধ্যে ৩ শতক দেওয়া হয় তৎকালীন ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা আবুল হোসেনের পক্ষে তার শ্যালক মফিজুর রহমানের নামে। আরও ৩ শতক যায় তৎকালীন ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা সৈয়দ নূরের পক্ষে তার শ্যালক ইফতেখারুল হাসানের নামে। বাকি ৩ শতক জমি রেজিস্ট্রি করা হয় তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) পঙ্কজ বড়ুয়ার পক্ষে তার দাদিশাশুড়ি দীপিকা বড়ুয়ার নামে।
অর্থাৎ অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা ৯ শতক জমি ভাগ হয়ে যায় তিনজনের মধ্যে। আর তিনজনই ছিলেন সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তাদের স্বজন বা তাদের পক্ষে জমি নেওয়া ব্যক্তি।
দুদকের অনুসন্ধানে জমি হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়াটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ, অভিযোগে যাদের বিরুদ্ধে সরকারি দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে জমি নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তাদের কারও নামেই ওই ৯ শতক জমি সরাসরি রেজিস্ট্রি হয়নি। বরং তাদের পক্ষে স্বজনদের নামে জমি নেওয়া হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। আবুল হোসেনের পক্ষে তার শ্যালক মফিজুর রহমান, সৈয়দ নূরের পক্ষে তার শ্যালক ইফতেখারুল হাসান এবং পঙ্কজ বড়ুয়ার পক্ষে তার দাদিশাশুড়ি দীপিকা বড়ুয়ার নামে জমি রেজিস্ট্রি হওয়ার বিষয়টি দুদকের অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এ কারণেই শুধু জমি হস্তান্তরের দলিল নয়, এর সঙ্গে নামজারি প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকার যোগসূত্রও খতিয়ে দেখে দুদক।
মামলার অনুমোদন পাওয়া পাঁচজনের মধ্যে রয়েছেন পঙ্কজ বড়ুয়া, সৈয়দ নূর, মফিজুর রহমান, ইফতেখারুল হাসান ও দীপিকা বড়ুয়া। তবে অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তৎকালীন ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা আবুল হোসেনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনি মারা যাওয়ায় তার বিরুদ্ধে আর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি উঠে এলেও মৃত্যুর কারণে তাকে মামলার আসামি করা হয়নি।
দুদকের সূত্র বলছে, ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল জমি হস্তান্তরের দলিল সম্পন্ন হলেও বিষয়টি নিয়ে দুদকের অনুসন্ধান হয়েছে পরে। অনুসন্ধানের সময় সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ড, দলিল ও নামজারি সংক্রান্ত নথিপত্রসহ অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য যাচাই করা হয়। দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর কমিশন এখন মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৬১, ১৬২ ও ১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
