সুখী সম্পর্কেও কেন হয় পরকীয়া?
পরকীয়া বা দাম্পত্য সম্পর্কের বাইরে প্রেমের সম্পর্ক—বিষয়টি নিয়ে সমাজে নানা ধরনের ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে যখন ভালোবাসা, বোঝাপড়া বা সুখ থাকে না, তখনই মানুষ অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, বাস্তবতা এতটা সরল নয়। শুধু অসুখী দাম্পত্য নয়, বাইরে থেকে সুখী ও স্থিতিশীল মনে হওয়া সম্পর্কেও পরকীয়া ঘটতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরকীয়া সাধারণত কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্তের ফল নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা একটি প্রক্রিয়া, যার পেছনে থাকে আবেগগত দূরত্ব, অপূর্ণ মানসিক চাহিদা, ব্যক্তিত্বগত বৈশিষ্ট্য, সম্পর্কের সংকট কিংবা নতুন অভিজ্ঞতার প্রতি আকর্ষণ।
আবেগগত দূরত্ব থেকেই শুরু:
সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরকীয়ার বীজ অনেক সময় রোপিত হয় সম্পর্কের ভেতরেই। যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আগের মতো কথা হয় না, একসঙ্গে সময় কাটানোর আগ্রহ কমে যায়, একজন অন্যজনের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করেন না বা ছোটখাটো বিষয় নিয়ে নিয়মিত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, তখন ধীরে ধীরে আবেগগত দূরত্ব বাড়তে থাকে।
এই দূরত্বের কারণে অনেকেই এমন একজন মানুষের খোঁজ পান, যিনি তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন, মূল্যায়ন করেন বা মানসিক সমর্থন দেন। সেখান থেকেই নতুন সম্পর্কের সূচনা হতে পারে।
সুখী সম্পর্কেও কেন ঘটে পরকীয়া?
গবেষণায় উঠে এসেছে, সব পরকীয়ার পেছনে দাম্পত্যে অসন্তুষ্টি কাজ করে না। অনেক সময় ব্যক্তি নিজের ভেতরের কিছু অপূর্ণতা পূরণ করতে গিয়ে সম্পর্কের বাইরে আকৃষ্ট হন।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পেছনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—নতুন অভিজ্ঞতার প্রতি প্রবল আকর্ষণ, নিজের আকর্ষণীয়তা বা গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করার ইচ্ছা, আত্মসম্মান বা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, একঘেয়ে জীবনে উত্তেজনা খোঁজা, ব্যক্তিত্বগত বৈশিষ্ট্য, যেমন অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বা তাৎক্ষণিক আবেগে সিদ্ধান্ত নেওয়া, মধ্যবয়সে জীবনের অর্থ বা পরিচয় নিয়ে ব্যক্তিগত সংকট।
অর্থাৎ, সম্পর্ক ভালো থাকলেও ব্যক্তিগত মানসিক চাহিদা বা আত্মপরিচয়ের সংকট অনেক সময় মানুষকে অন্য সম্পর্কে জড়াতে প্রভাবিত করতে পারে।
পরকীয়া একদিনে শুরু হয় না: বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ পরকীয়া ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে। প্রথমে পরিচয়, এরপর নিয়মিত যোগাযোগ, তারপর ব্যক্তিগত অনুভূতি ভাগাভাগি। একসময় সেই মানুষটিই হয়ে ওঠেন মানসিক আশ্রয়। এরপর সম্পর্কটি গোপন রাখার প্রবণতা তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে সেটি প্রেম বা শারীরিক সম্পর্কে রূপ নিতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘ইমোশনাল স্লিপ’—অর্থাৎ ছোট ছোট আবেগগত সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা, যা শেষ পর্যন্ত সম্পর্কের বাইরে ঘনিষ্ঠতার দিকে নিয়ে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি ঝুঁকি বাড়িয়েছে?
ডিজিটাল যুগে পরকীয়ার ধরনও বদলেছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম কিংবা অফিসের অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়া এখন অনেক সহজ।
গবেষকদের মতে, অনেক সম্পর্কের শুরু হয় কেবল বন্ধুত্ব বা সাধারণ আলাপচারিতা দিয়ে। কিন্তু যখন একজন ব্যক্তি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি বা সমস্যার কথা সঙ্গীর বদলে অন্য কারও সঙ্গে বেশি ভাগ করে নিতে শুরু করেন, তখন সেটি আবেগগত পরকীয়ার দিকে এগোতে পারে।
শুধু শারীরিক সম্পর্কই নয়
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, পরকীয়া শুধু শারীরিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক সময় আবেগগত ঘনিষ্ঠতাও দাম্পত্য সম্পর্কে গভীর প্রভাব ফেলে।
এমন অনেক দম্পতি আছেন, যাদের মধ্যে শারীরিক বিশ্বাসভঙ্গ না হলেও গোপন আবেগগত সম্পর্কের কারণে বিশ্বাস নষ্ট হয়েছে। অনেকের কাছে এটিও সমান কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কোন লক্ষণগুলো হতে পারে সতর্কবার্তা?
সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিচের পরিবর্তনগুলো দেখা দিলে সম্পর্কের প্রতি আরও মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন—আগের তুলনায় যোগাযোগ কমে যাওয়া, একসঙ্গে সময় কাটাতে অনীহা, মোবাইল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে অতিরিক্ত গোপনীয়তা, সঙ্গীর সঙ্গে ব্যক্তিগত অনুভূতি ভাগ করে না নেওয়া, ছোটখাটো বিষয়েও ঘন ঘন বিরোধ, অন্য কারও সঙ্গে অস্বাভাবিক আবেগগত ঘনিষ্ঠতা ইত্যাদি
তবে এসব লক্ষণ মানেই পরকীয়া—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। এগুলো সম্পর্কের সংকেত হিসেবে বিবেচনা করে খোলামেলা আলোচনা করাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে কী করবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি চারটি—বিশ্বাস, সম্মান, যোগাযোগ ও সহমর্মিতা।
তাঁদের পরামর্শ—নিয়মিত খোলামেলা কথা বলুন। সঙ্গীর অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন। একসঙ্গে মানসম্মত সময় কাটানোর চেষ্টা করুন। অভিমান বা ক্ষোভ দীর্ঘদিন জমতে দেবেন না। একে অপরের সাফল্য ও অবদানকে স্বীকৃতি দিন। সম্পর্কের সীমারেখা ও প্রত্যাশা নিয়ে স্পষ্ট থাকুন। সমস্যা জটিল হলে পেশাদার কাউন্সেলর বা সম্পর্ক বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিন।
বিচার নয়, প্রয়োজন বোঝাপড়া
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করিয়ে দেন, সব পরকীয়ার পেছনের কারণ এক নয়। প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিত্ব, পারিবারিক পরিবেশ, মানসিক অবস্থা এবং সম্পর্কের বাস্তবতা আলাদা।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—পরকীয়া কখনোই কেবল একটি মুহূর্তের ভুল নয়। এটি প্রায়ই দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া নানা মানসিক ও সম্পর্কগত পরিবর্তনের ফল। তাই এমন পরিস্থিতি এড়াতে শুরু থেকেই সম্পর্কের সমস্যাগুলো নিয়ে আন্তরিকভাবে কথা বলা এবং একে অপরের আবেগগত চাহিদার প্রতি সংবেদনশীল থাকা জরুরি।
সম্পর্ক টিকে থাকে শুধু ভালোবাসায় নয়; টিকে থাকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, স্বচ্ছতা এবং নিয়মিত যোগাযোগের ওপর। দাম্পত্য জীবনে মতভেদ বা সংকট আসতেই পারে। কিন্তু সেই সংকটকে উপেক্ষা না করে সময়মতো সমাধানের চেষ্টা করলে অনেক সম্পর্কই নতুন করে শক্ত ভিত্তি ফিরে পেতে পারে। আর সেটিই হতে পারে পরকীয়ার ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
