মনে খারাপ চিন্তা এলে কি গোনাহ হয়?
মানুষের মন কখনো স্থির থাকে না। ভালো-মন্দ নানা ধরনের চিন্তা সেখানে আসে। কখনো এমন কিছু ভাবনাও হঠাৎ মনে আসে, যা মানুষ নিজেই চায় না। নামাজের সময়, ইবাদতের মুহূর্তে কিংবা নিরিবিলি থাকলেও অনাকাঙ্ক্ষিত নানা চিন্তা মাথায় ঘুরতে পারে। তখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—শুধু মনে খারাপ চিন্তা আসার কারণেই কি গোনাহ হবে?
ইসলামে এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মনে কোনো চিন্তা আসা এবং সেই চিন্তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে লালন করা এক বিষয় নয়। তাই মনের ভেতর আসা সব ধরনের চিন্তাকে একইভাবে বিচার করা যায় না।
এ বিষয়ে ইসলামী স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহ তাঁর একটি বক্তব্যে বলেন, মনে খারাপ চিন্তা হলে সেটির ধরন বিবেচনা করতে হবে। কারণ, অনিচ্ছায় মনে আসা চিন্তা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মন্দ কাজের পরিকল্পনা বা কল্পনা করা এক নয়।
অনেক সময় মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হঠাৎ কোনো খারাপ বা অশোভন চিন্তা মনে চলে আসে। মানুষ সেটি পছন্দ করে না এবং চিন্তাটি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। এমন অনিচ্ছাকৃত ভাবনাকে কেন্দ্র করে নিজেকে অতিরিক্ত অপরাধী মনে করার কারণ নেই। বরং কোনো মন্দ কাজের চিন্তা মনে আসার পর যদি কেউ আল্লাহর ভয়ে তা থেকে ফিরে আসে এবং সেই কাজটি না করে, তাহলে তার এই বিরত থাকাটিও সওয়াবের কারণ হতে পারে।
অর্থাৎ, মনে কোনো খারাপ চিন্তা আসা আর সেটিকে কাজে পরিণত করার ইচ্ছা পোষণ করা এক জিনিস নয়।
অন্যদিকে, কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো অন্যায় বা অশ্লীল চিন্তাকে মনে লালন করতে থাকে, অন্যের চরিত্র নিয়ে কুৎসিত কল্পনা করে কিংবা অশোভন আকাঙ্ক্ষাকে সচেতনভাবে উপভোগ করতে থাকে, তাহলে বিষয়টি ভিন্ন। এ ক্ষেত্রে শুধু ‘চিন্তা তো মনের মধ্যেই ছিল’ বলে বিষয়টিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ মানুষের অন্তরের ইচ্ছা, সংকল্প ও প্রবৃত্তিরও ইসলামে গুরুত্ব রয়েছে।
তবে এ বিষয়েও একটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি—হঠাৎ অনিচ্ছায় কোনো চিন্তা চলে আসা এবং সেটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে ধরে রাখা বা অনুসরণ করা এক নয়।
এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিসে কুদসি রয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) জানিয়েছেন, আল্লাহ তাআলা মানুষের ভালো ও মন্দ কাজের হিসাব নির্ধারণ করেছেন। কেউ ভালো কাজের ইচ্ছা করেও তা করতে না পারলে তার জন্য একটি পূর্ণ নেকি লেখা হয়। আর সে কাজটি করলে তার জন্য দশ থেকে সাতশ গুণ, এমনকি এর চেয়েও বেশি নেকি লেখা হতে পারে।
অন্যদিকে, কেউ কোনো মন্দ কাজের ইচ্ছা করেও তা বাস্তবে না করলে তার জন্য একটি পূর্ণ নেকি লেখা হয়। আর সে যদি সেই মন্দ কাজটি করে ফেলে, তখন তার জন্য একটি গোনাহ লেখা হয়।
—সহিহ বুখারি: ৬৪৯১; সহিহ মুসলিম: ১৩১
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, মন্দ কাজের চিন্তা বা ইচ্ছা থেকে ফিরে আসারও মূল্য রয়েছে। আল্লাহর ভয় ও ঈমানের কারণে কেউ কোনো অন্যায় কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখলে সেটি তার জন্য কল্যাণের কারণ হতে পারে।
নামাজের সময়ও অনেকের মাথায় অপ্রাসঙ্গিক বা খারাপ চিন্তা চলে আসে। এতে কেউ কেউ মনে করেন, তাঁদের নামাজ বা ঈমান বুঝি নষ্ট হয়ে গেছে। বাস্তবে মানুষের মনোযোগ ধরে রাখা সবসময় সহজ নয়। এ ধরনের অনিচ্ছাকৃত চিন্তা এলে আতঙ্কিত না হয়ে আবার মনোযোগ নামাজের দিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা উচিত। চিন্তা চলে আসার কারণে নিজেকে নিয়ে অতিরিক্ত অপরাধবোধে ভোগার প্রয়োজন নেই।
মনে কোনো চিন্তা আসা মানুষের স্বাভাবিক মানসিক প্রক্রিয়ার অংশ। অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো খারাপ চিন্তা মনে আসা এবং ইচ্ছা করে সেই চিন্তাকে লালন করা বা বাস্তবে রূপ দেওয়া—দুটিকে এক করে দেখা ঠিক নয়।
ইসলামের শিক্ষা হলো, মন্দ চিন্তা বা প্রবৃত্তি এলে তা থেকে ফিরে আসা এবং নিজেকে অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখা। তাই অনিচ্ছাকৃত কোনো কু-চিন্তা মনে এলে আতঙ্কিত না হয়ে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া, চিন্তাটি এড়িয়ে যাওয়া এবং ভালো কাজে মনোযোগ দেওয়াই উত্তম।
মনের দরজায় কোনো খারাপ চিন্তা কড়া নাড়তেই পারে; কিন্তু সেটিকে ঘরে জায়গা দেওয়া আর দরজা বন্ধ করে দেওয়া—দুটো এক নয়।
